হোসে সারামাগোর ‘অন্ধত্ব’ নিয়ে

blindness

সালাহ্ উদ্দিন শুভ্র

হোসে সারামাগোর উপন্যাস অন্ধত্ব পড়ে পাঠকের মানসিক বিভ্রম তৈরি হতে পারে। কারণ এই উপন্যাসে একটা নামহীন শহর আছে যেখানে একে একে মানুষেরা অন্ধ হয়ে যায় কোন কারণ ছাড়াই। তারা অন্ধ হয়ে কালো কালো দেখে না, তারা দেখে উল্টা- শাদা শাদা। অন্ধত্ব মানেই যে আলোহীনতা তা না, সীমাহীন আলোও অন্ধত্ব হতে পারে। উপন্যাসে ঢুকতে হয় এক গাড়ি চালকের অন্ধ হওয়ার ঘটনা দিয়ে। গাড়ির লাল সিগন্যাল সবুজ হয়ে যাওয়ার সময়টাতেই অন্ধ হন লোকটা। তাকে বাড়ি পৌঁছে দেয় যে সে একজন গাড়ি চোর, প্রথম অন্ধ লোকের বউ, প্রথম অন্ধ লোক যে ডাক্তারের কাছে যায় সে, এই ডাক্তারের কাছে যারা আসেন চোখ দেখাতে তারা। সেখানে কালো চশমা পরা একটা মেয়ে যে কিনা নিজস্ব শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করে অর্থের বিনিময়ে সেও অন্ধ হয়। তার সাথে সর্বশেষ যে লোকটা সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিল সেও অন্ধ হয়, অন্ধ হয় কালো চশমা পরা মেয়েটাকে উদ্ধার করে যে পুলিশ, সেও। অন্ধ হয় এমন আরো আরো অনেকেই যারা সবাই অন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে শাদা দেখে।

গোটা শহরে, এই উপন্যাস মতে, একজন ছাড়া সবাই অন্ধ হয়ে যায়। সেই একজন ডাক্তারের বউ, বা বলা যায় অপথালমোলোজিস্টের বউ। সে একাই অন্ধদের মাঝে চোখে দেখে। বাকিরা গোটা শহরের মানুষ-আইন-প্রশাসন-সরকার-সেনাবাহিনী-ব্যাংক, সবাই অন্ধ হয়ে যায়। সারামাগো সুররিয়ালিজম ভালোবাসেন। তাই তার অন্ধত্ব উপন্যাসে কোন চরিত্রকে নাম দিয়ে চিহ্নিত করেন নাই। শারীরিক বা সামাজিক বা পেশাগত পরিচয়েই তারা অন্ধ দু চোখ নিয়ে উপন্যাসময় বিরাজ করেছেন। তারা একে অপরের সাথে নানা সামাজিক মানবিক সম্পর্কে সম্পৃক্ততার কারণে অন্ধ হয়ে পড়ছেন, কিন্তু অন্ধ বলেই বা এই যে এভাবে অন্ধ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক নয় বলে, তাছাড়া অন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো কারণ-এর সমাধান না থাকলে হতবিহ্বল জনতা কে কীভাবে কার সাথে কোন সম্পর্কের সূত্রে একে একে অন্ধ হয়ে যায় তা বুঝে উঠতে পারে না। অন্ধ জনতা সরকার বা প্রশাসনের জন্য- স্বাভাবিক জনজীবনের জন্য অপাংক্তেয় তো বটেই, সেই অন্ধত্ব যদি আবার ছোঁয়াচে হয় তাহলে যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে তা আতঙ্কগ্রস্ত হবার মতোই। আর যারা অন্ধ হচ্ছেন তাদের অসহায়ত্ব, দেখা ভুবনের রূপ রাতারাতি পাল্টে যাওয়া, অভ্যস্ত জীবনটাকে শুরু করতে হয় আবার প্রথম থেকে। লম্বা লম্বা বাক্যে সারামাগো সীমানাহীন জনতার অন্ধত্ব জনিত যে সংকট এঁকেছেন তা পাঠককে অন্ধ করে না তুলুক তার দেখার চোখ সম্পর্কে সংশয় জাগায় নিশ্চিতভাবেই।

অন্ধ হবার পরে সরকারি সীদ্ধান্ত মোতাবেক অন্ধদের থাকার জন্য বিভিন্ন জায়গা ঠিক হয়। প্রথম দিকে যারা অন্ধ হন তাদের রাখা হয় একটা কোয়ারেন্টাইনে। মূলত মানসিকভাবে যারা অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত তাদের থাকার জায়গা। কোয়ারেন্টাইনের জীবন চোখে দেখা মানুষের জীবনের চাইতে আলাদা কিছু নয়। গুয়ে-গন্ধে-খাবারের সংকটে এর সাথে যৌনতা, বেঁচে থাকবার আরো সকল মনুষ্য কর্মকাণ্ড সংগঠিত হয় যেখানে অসংখ্য অন্ধ লোক আর একজন নারী যিনি চোখে দেখেন তারা সেনাবাহিনীর নজরে রাষ্ট্রের সীদ্ধান্তে দিনাতিবাহিত করেন। সারামাগো কেবল এক অন্ধত্ব নিয়ে তাও আবার অনির্ধারিত-অভাবিত এক অন্ধত্ব, যেই অন্ধত্ব আসলে সব কিছুকে অতি আলোয় ভরিয়ে ফেলে। এনলাইটেনমেন্ট মানে যে আলোকিত হওয়া, যে এনলাইটেনমেন্ট নিয়ে এসেছে সভ্যতা-সকল প্রকার অন্ধত্ব যার মানে হচ্ছে কালো তাকে সারামাগো মোকবেলা করেছেন অন্য এক অন্ধত্বকে হাজির করে। অতি আলোক সংকটে বিভ্রান্ত-বিপর্যস্ত এক দল লোক বেঁচে থাকবার কষ্টকে বুঝতে পারে, কাতারে কাতারে তারা খুন হয়- সেনাবাহিনীর অন্ধত্বে। অন্ধ হব না বলে তারা সকল প্রকার ছোঁয়াচ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে আর দেখা চোখেই তারা অন্যদের কেবল অসুস্থ, হানিকর আর গুলিভূক মনে করে। তারা মনে করে অন্যদের অর্থাৎ যারা অলৌকিক অন্ধত্বে ভুগছে তাদের মেরে ফেললেই নিজেরা দেখতে পাবে। কিন্তু রক্ষা পায় না কেউ।

সেনাবাহিনীর সবাই একে একে অন্ধ হয়, অন্ধ হয় সরকারের মন্ত্রীরা। ওলট পালট শহরে কেবল পড়ে থাকে লাশ-মৃত্যু আর ক্ষুধাক্রান্ত কুকুরেরা। তাদের দাঁতে চিবুকে মানুষের মাংস লেগে থাকে। অন্ধ লোকেরা যখন কোয়ারেন্টাইন থেকে বেরিয়ে আসে তখন অন্য এক শহর তারা দেখে। তাদের ঘর বাড়ির দখল নিয়ে যায় অন্য কোন অন্ধ। অন্ধ বলে দখলদারিত্ব-বঞ্চণা-ক্ষমতার দাপট নাই হয়ে যায় নাই। ভুখা নাঙ্গা মানুষেরা সমাবেশও করে। সংগঠন, বারে বারেই সারামাগো উল্লেখ করেছেন সংগঠনের কথা। প্রথম যখন তারা কোয়ারেন্টাইনে যায় তখন থেকেই বলে আসছেন তিনি সংগঠনের কথা। প্রয়োজন যদি অনিবার্য হয়, প্রয়োজন যদি হয় যে একদল লোক কিছুই দেখে না, তাহলে সবাই মিলে যা দেখে মানে একদল অন্ধ মানুষ একত্রিত হলে যে শক্তি তৈরি হয়, ভেবে ভেবে নিজেরা মিলে যে পথ রচনা করে তা-ই তাদের খাবার বয়ে নিয়ে আসবার আর বদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার উপায়ও বাতলে দেয়। যাদের চোখ ভালো তারা যেমন খাট দেখেন, বাঁ দিক থেকে বা ডান দিক থেকে অন্ধ লোকেরাও কোয়ারেন্টাইনে গুনে গুনে নিজের খাট খুঁজে নিতেন। তাদের খাবার দিয়ে যেত সেনাবাহিনী যেখানে, দড়ি বেঁধে বা কখনো একে অন্যকে ধরে ধরে তারা খাবার নিয়ে আসতো, নিজেরা খেত। কেবল গু মুতের জায়গাটা তাদের এলোমেলো হয়ে যেত। কিন্তু চোখে দেখার সভ্যতায়ও তো ভালো চোখের মানুষেরা গুয়ে মুতে মাখামাখি হয়ে যান। অন্ধ লোকগুলোও যখন সঙ্গম করে, মানবিক সকল প্রকার অনুভূতি দ্বারা তাড়িত হন- তখন ভাবতে হয় অন্ধ আসলে কারা। বা যখন একদল লোক লাঠি হাতে সকল খাবারের দখল নেয় এবং যখন তারা ঘোষণা করে যে যার যা আছে তার সব না দিয়ে খাবার দেয়া হবে না কাউকেই এরপর সবাই যখন যার যা ছিল- এখানেও ভাবতে হয় যে অন্ধরাও কার কী আছে সেই সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত থাকে।

তো সেই অন্ধ ডাকাতরা যারা কেবল দুধশাদাই দেখতো তারাও এভাবে খাবার দখলের দিনকয়েক পরে দাবি করলো তাদের নারী সরবরাহ করতে হবে- নইলে তারা খাবার দিবে না। অন্ধ-বন্ধ গুমোট গুয়ে মুতে একাকার সেই কোয়ারেন্টাইন হয়ে উঠলো আলোকময়তার সভ্যতা। এরপর নারীরা ডাকাতদের কাছে যায় তাদের শরীর বেচতে- বিনিময়ে তারা খাবার পাবে। নারীর শরীর বেচা না হলে অন্ধ হোক বা চোখে দেখতে পারে এমন লোক-ই হোক সমাজে অনেকেরই ভাত জোটে না। এবং কোন জাতীর প্রবণতাকে বুঝতে হলে নারীদের কাছেই যেতে হয়। সারামাগোও নারীদের কাছে গিয়েছেন। এত এত অন্ধ লোকের মাঝে একজনই কেবল দেখতে পান- তিনি অপথালমোলোজিস্টের বউ। তিনি যে দেখতে পান নগ্ন-অসহায় একদল মানুষ-তিনি আসলে হুঙ্কার করে ছুটে চলা মানবসভ্যতাকেই দেখেন। তিনি যে দেখতে পান তার স্বামী সঙ্গম করছে ওই কালো চশমা পরা মেয়েটার সাথে আসলে তিনি স্বাভাবিক মানুষের আচরণই দেখতে পান। বা কালো চশমা পরা মেয়েটা, বা ওই নোংরা আবর্জনার মাঝে ঠাঁই করে নেয়া এক জোড়া নারী-পুরুষ পরম শিৎকারে দেহ মিলনে ব্যস্ত-অথচ তারা অন্ধ। সারামাগো ফলে অন্ধদের নিয়ে লেখেন নাই- তিনি লিখছেন অন্ধত্ব নিয়া। অন্ধত্বে অনুপ্রবিষ্ট হইছেন তিনি। সেখানে দেখা জগতের কোন রূপ নাই। মানুষ সেই শাদা শাদা রঙের ভেতর জীবনের যে সকল চিত্রকর্ম আঁকে সবই হারায়া যায়, অনির্বচনীয় এক শাদায় সব ডুবে যায়। ফলে চার্চের গায়ে গায়ে অংকিত দেবতাদের আর তাদের অনুসারিদের সবার চোখেই থাকে শাদা পট্টি বাঁধা। ইতিহাস বাহিত এই রোগ আসলে। অতি বেশি দেখার বা মূলত দেখবার দখল নিতে গেলে হয়তো এমন একটা শাদা রোগ হতে পারে সবার। শাদা রোগ চোখে নিয়ে, চেনা জগত না দেখতে দেখতে, অন্ধ লোকগুলো যখন আবার চোখে ফিরে পায় তখন তাদের মনে হতে থাকে তারা কি আসলেই দেখে। বরং অন্ধ হয়ে থাকার সময়টাই তাদের ভালো আর নিরাপদ, তাদের বরং তা অনেক বেশি মানসিক স্বস্তি এনে দিয়েছিল। কেবল হুট করেই অন্ধ হয়ে যাবার আতঙ্ক ছাড়া।

যে একবার অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, বা হুড়োহুড়ি বা সেনাবাহিনীর গুলি থেকে বেঁচে গিয়েছিল তারা ভাবতেই পারে এই চোখে তাদের আর কী দেখার বাকি আছে। সারামাগোর এই শহর ঢাকাও হতে পারে, দিল্লি-হিল্লি যে কোথাও হতে পারে। কারণ সব জায়গাতেই নারী তার দুই পা ফাঁক না করলে সভ্যতার অগ্রগামীতা আর টিকে থাকা অসম্ভব-ই, এমন কি তারা অন্ধ থাকলেও। অন্ধ মানেই অন্ধত্বে ভুগা না, অন্ধত্বে ভুগে সবাই, যারা দেখে তারা আরো বেশি। অনেক মেটাফোরকে যুক্ত করেছেন সারামাগো। রাষ্ট্র-পুলিশ-তার অন্তর্ভুক্ত নগণ্য-নারী-সমাজ। জীবন-মৃত্যু-লাশ। সব কিছুকে আরেকবার দেখে নেয়া যেত ভালো চোখের মানুষেরা অন্ধ হয়ে গেলে। সেই সাহস যাদের নাই তারা উপন্যাসটা পড়ে দেখতে পারেন। কালো পট্টিওয়ালা এক লোক আছে উপন্যাসে। বুড়ো। তার চেহারার একটা বদখত বর্ণনাই দিয়েছেন সারামাগো। সেই লোকের প্রেমে পড়ে কালো চশমাওয়ালা মেয়েটা। লোকটা তাকে নিষেধ করেছিল, বলেছিল আবার যদি চোখে দেখতে পায় তাহলে হয়তো মেয়েটা সীদ্ধান্ত পাল্টে ফেলবে। কিন্তু কালো চশমা মেয়েটা চোখ ভালো হলেও সেই লোকের প্রেমকে অস্বীকার করে না। তারা অন্ধ হয়ে যে আবেগ অনুভূতি তৈরি করেছে, চেনা জগতেরই আরো রূঢ় আর বাস্তবকে দেখেছে, দেখা চোখে তাই তাদের অবিশ্বাস জাগে। অপথালমলোজিস্টের বউ যে কিনা একাই চোখে দেখত সেও এক লেখকের প্রেমে পড়ে।

এই লেখক প্রথম অন্ধ হয়ে যাওয়া লোকটার বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছে। তারও দিন চলে যায় দুধশাদা অন্ধত্বে। কিন্তু তিনি লিখছেন- তিনি ভাবছেন তিনি কেবলই এক পথিক- যা জানছেন আর যা জানছেন না সবই তিনি লিখে রাখছেন। পথের ধারেই লিখে চলেছেন- বিরূপ এক সময়ে যখন তিনি নির্বাসিত এবং একইসাথে দৃষ্টিশক্তিহীন। তিনি কাগজের ওপর কাগজ রেখে লিখে চলেছেন- কাউকে না কাউকে তো লিখে রাখতেই হয়- ইতিহাসের কথা- মানুষেদের কথা। সারামাগো হয়তো নিজের কথাই বলছেন এই চরিত্রে হাজির হয়ে। এমন অনেক ব্যক্তি আর বিষয়কে তিনি অন্ধত্বে পর্যবসিত সম্পর্ক দিয়ে সম্পৃক্ত করছেন। কিম্বা আসলে সেই কালো পট্টিওয়ালা লোকটা যখন চোখের দৃষ্টি ফিরে পায় তখন তার যে মনে হয়, আমার মনে হয় না আমরা অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, আমার মনে হয় আমরা অন্ধ, অন্ধ কিন্তু দেখতে পাই, অন্ধ জনতা দেখতে পায়, কিন্তু দেখে না। তার এই মনে হওয়া এক অদ্ভূত দুধ শাদা দেখতে না পাওয়া আলোতে নিমজ্জিত করে পাঠককেও। ……………………………………………..

হোসে সারামাগোর অন্ধত্ব বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন শওকত হোসেন। বইটি প্রকাশ করেছে সন্দেশ।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s