শাহীন আখতারের ‘সখী রঙ্গমালা’ : শুধু রাজচন্দ্রের গীত

shokhi rongomala

সালাহ্ উদ্দিন শুভ্র

সখী রঙ্গমালায় এক ইতিহাস আছে। চৌধুরীদের ইতিহাস। প্রাচীন ভুলুয়া এলাকার বিলীন রাজবাড়ির চৌধুরীরা একদা জলটুঙ্গি ব্যবহার করিত। তাহাদের ইচ্ছা হইলে দীঘি কাটিতেন, নরবাড়ীতে যাইতেন। তাহারা প্রজাদের টঙ্ক মারিয়া সেই নরবাড়ীর কন্যা যার নাম রঙ্গমালা (এমন একটা নাম কেমন করিয়া ব্রাত্য জীবনে আসিলো তা কে জানে। কিন্তু এমন একটা নাম ছিলই) এবং সেই নারীটির যারপরনাই রূপে, যদিও সে কেমন রূপ তা বুঝিতে পারা যায় না, তারপরও যেহেতু ইতিহাসে সেই নামটি ছিলই এবং তার জন্য দিওয়ানা ছিল চৌধুরী রাজেন্দ্র সেহেতু ইতিহাস তার পায়ে আসিয়া লুটিয়া পড়িলো এবং এ সকল ইতিহাস জানিতে পারা যাবে ‘সখী রঙ্গমালা’ উপন্যাসে, যে উপন্যাসে প্রজাদের টঙ্কা মারিয়া দিয়া চৌধুরীদের বিলাসী ভালোবাসা যাপিত হয়। শুধু প্রজা কেন বিয়ে করা বউ ফুলেশ্বরীর গহনাপাতিও রাজেন্দ্র মারিয়া দিত। এই ফুলেশ্বরী না কি এক সময় পাগল হইয়া যায়, কখন, কেন কে তাহাকে পাগল বলিয়া ডাকিতো তার কোন আলাপ নাই, কিন্তু লেখক খুব সহজেই একবারে উপন্যাসের প্রায় শুরুতেই ফুলেশ্বরীর পাগল খেতাব প্রাপ্তির খবর জানাইলেন। আরো কয়েকজন পাগল মতন চরিত্র আছে আমাদের ইতিহাসে, এই ‘সখী রঙ্গমালা’ উপন্যাস পড়িলেই জানিতে পারা যাবে। কিন্তু কেন তাহারা পাগল হইলেন, কে তাহাদের পাগল বানাইলো, কী ঘটনায় পড়িয়া, কাহার অত্যাচার সহিয়া এই অবোধ লোকগুলা পাগল হইল তারা তালাশ কিন্তু উপন্যাসে পাওয়া যায় না। কারণ ‘সখী রঙ্গমালা’ পাগলদের উপন্যাস নহে, এই উপন্যাস কোন চাষাভূষা, কবিরাজেরও নহে। এই উপন্যাস চৌধুরীদের উপন্যাস। চৌধুরীদের যে ষণ্ডা ছেলে রাজচন্দ্র, ধর্ষণ করিয়া বেড়ায়, চুরি করিয়া বেড়ায়, একে তাকে হুমকি দিয়া বেড়ায়, ছোটবেলা থেকেই যাহার চোখ নারী শরীরে আঁতিপাঁতি ঘোরে। বিয়ে করা বউয়ের দিকে যার ভুলেও নজর পড়ে না, সেই রাজচন্দ্র কি না প্রেমে পড়িলো। প্রেমে পড়িলো তাও এক নরবাড়ির মেয়ের, সে কী প্রেম! সেই প্রেমের-ই কাহিনী ‘সখী রঙ্গমালা’। কিন্তু ইতিহাসে কি প্রেম কখনো টিকিয়া থাকে? না কি ইতিহাসের প্রেমের গাছে ঝুমকা ফুল ফোটে? বিরহই বাঙালির প্রেম।

বংশের জাত বাঁচাইতে চৌধুরী নারায়ণ, যিনি কিনা রাজচন্দ্রের কাকা তিনি তার লাইঠ্যাল চান্দারে নির্দেশ দিলেন নরবাড়ি জ্বালায়া দিতে। চান্দা নরবাড়ি তো জ্বালাইলোই, রাঙ্গার মাথাও কাটিয়া ফেলিল। আহা রাঙ্গা, জীবনের শেষমুহূর্তে রাজচন্দ্রের আশা নাই দেখিয়া চান্দাকেই নাগর মানিতে রাজি ছিলো। কিন্তু চান্দা আসলে রক্ত কাপালিক, লহুর ধারা চেনে, প্রেম চেনে না। অমন রূপসী মুখও তার শত্রু। কাটিয়া ফলিলো রাঙ্গার কল্লা। আর সেই কাটা কল্লা হইলো ইতিহাস। উপন্যাস পড়িতে পড়িতে, কাটা মুণ্ডুর পূর্ণজন্মকালে একটা প্রশ্ন হুস করিয়া রঙ্গমালার দিঘী হইতে জাগিয়া উঠে। কে তবে ইতিহাস, জীবিত রঙ্গ না কি তার কাটা মুণ্ডু। কিন্তু কোনভাবেই কি তা রাজচন্দ্র? ‘হীরা, নরবাড়ি যা’নের হঁথ চিনস নি?’ প্রশ্নটা ফুলেশ্বরীর, করেছে তার দাসী হীরাকে। এত বছর পরে, জামাইয়ের বাড়িতে এতদিন থেকেও যে জামাইসংসর্গে যেতে পারে নাই, সেই বিরহী বধূর কাতর কৌতূহল সে রঙ্গের বাড়ি যাবে, রঙ্গকে দেখবে, তার পরুষ কি করে তা দেখবে। এই দেখতে যাওয়াটা হয়তো ইতিহাস নয়, কিন্তু ইতিহাসের ফুলেশ্বরীদের জন্য এ কোন অভিসারেরও পথ নয়। তাদের এই দেখতে যাওয়ার পথে মর্মরিত শুষ্ক পত্রের মতোই পড়ে থাকে যে সকল বোধেরা আর শ্যামপ্রিয়ারা। ইতিহাসে এদের আসন যাওন খালি এক রাজচন্দ্রদের বেঁচে থাকবার খাঁই হিসেবে। ইতিহাসের সেই ঝরাপাতা যারা তুলে আনেন তাদের কাছেও।

‘সখী রঙ্গমালা’ তাই চৌধুরীদের ইতিহাস-ই কেবল তৈরি করেছে। শ্যামপ্রিয়া তার একটা ভালো নজির হতে পারে। রঙ্গমালাও তাই। রাজপুরুষদের আশ মিটে কিসে, লালসায় আর রক্তে। রঙ্গমালার পরিণতিও একই, শ্যমপ্রিয়াও তাই, ফলে তারা আসলে রাজচন্দ্রদেরই ইতিহাস। কিন্তু তার কাটা মুণ্ডু ভিন্ন কথা বলে। রাঙ্গার কাটা মুণ্ডু দেখতে যাওয়ার কোন পথ থাকে না। এই উপন্যাসের প্রধান সড়ক যে নরবাড়ি আর চৌধুরীদের বাড়ি যাওয়া আসার পথ , কাটা মুণ্ডুর তেমন কোন পথ থকে না বলেই, কাটা মুণ্ডু রাজবাড়ির হিংস্রতার প্রতীকায়ন বলেই, কাটামুণ্ডু লোকায়ত বলেই- কাটা মুণ্ডুই আসলে সেই ইতিহাস যা চৌধুরীদের বিরুদ্ধাচরণ করে। কাটা মুণ্ডু যে পালাগানের জন্ম দিয়েছে, যে কৃত্যের জন্ম দিয়েছে, এর সবই রাজকেন্দ্রিক বন্ধ্যাত্বকে উপহাস করে, লৌকিক ইতিহাসের জন্ম দেয়। ‘সখী রঙ্গমালা’ ইতিহাসের পুনঃলিখনমাত্র, তাও চৌধুরীদের ইতিহাস। ইতিহাসের চৌধুরীরা এমনি এমনি শক্তিশালী হয় নাই। আমাদের ইতিহাসে কাটা মুণ্ডু বছর বছর জেগে ওঠে। রাহু যেমন জাগে। এই ক্ষমতাশীলদের হাতে কাটাপড়া মুণ্ডু কীভাবে কাটা পড়লো তা এক ইতিহাস । অন্য আরেক ইতিহাস থাকে সেই কাটা মুণ্ডুর কীর্তি নিয়ে। সেই কাটু মুণ্ডুর জামাতে একে একে হাজির হয় আদম আলী, দূর্গা দাসী। আদম আলী যেমন রঙ্গমালার দিঘীর পাড়ে নিয়ত করে নামাজ পড়ে। কী আশ্চর্য সে রঙ্গমালারে দেখে নাই পর্যন্ত। অথচ এই আদম আলী উপন্যাসের এক কোণায় পড়ে গেছে। তাও রাজচন্দ্রের দৃষ্টিসীমায় বা জমিদারির অনুকম্পায় তার শরীরী হাজিরা আছে কেবল। এই আদম আলী বাণিজ্যের জন্য বিদেশ পাড়ি দিছিলেন। পথে এক ডাইনির খপ্পরে পড়েন- পালায়া আসেন ভেলায় চইড়া। এমন একটা মহাকাব্যিক ভ্রমণের তরঙ্গবিহীন তরল বয়ান ঠিক যেন ঐতিহাসিক হইতে পারে না। তার এই ভ্রমণ যেন রঙ্গমালার দীঘির পাড়ে আর রাজচন্দ্রের সাথে রাজেন্দ্রের যুদ্ধকালে হাজিরা দেবার জন্য। শেষমেশ কী হইলো আদম আলীর তাও জানা যায় না। অথচ এমন একটা চরিত্র অডিসিরেও হার মানাইতে পারে- বেঁচে থাকায়-প্রাণে-লড়াইয়ে-নিজস্বতায়।

সুমদ্র ভ্রমণে যাওয়া এমন একটা চরিত্র পাঠের লালা মুখে জমলেও তা শেষমেশ গিলে ফেলতেই হইলো। দূর্গা দাসীও সব হারা হল। জ্বলে উঠেছিল যে চন্দ্রকলা সেও হারিয়ে যায়। নারীদের জেগে ওঠা হয় না, কাঁদাও হয় না। খালি এক রাজচন্দ্ররাই তড়পায় ইতিহাসময়। তার সুখে শান্তিতে বসবাসের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে ইতিহাস। ফাঁকে তালে ঝরে যায় ফুলেশ্বরীদের গর্ভ। বিচার ছাড়াই। আবারো বিয়ে করে রাজচন্দ্র, ঘরে তার আরেক জবান মাথাকুটে মরে হয়তো। ফলে ‘সখী রঙ্গমালা’ জমিদারীর ইতিহাসকেই হাজির করে। এই উপন্যাসের গতরে যে গন্ধ-পোশাক-খাদ্য এমন কি চিকিৎসা পদ্ধতি, সেও রাজকীয়। আর যে রঙ্গমালা সে জমিদার নয়, সে নরবাড়ির লোক। তার বাবা যাত্রাপালা করেন। তখন রঙ্গমালারা সুখেই ছিল। কিন্তু তার বাবা যাত্রাপালা ছেড়ে দিলে তাদের বিপদে পড়তে হয়। সংসার চালানোর প্রয়োজনে তারা রামগুইত্যার সাথে রঙ্গমালার বিয়ে দেন। কিন্তু কুঁজো বরকে দেখে ভয়ে আতঙ্কে রঙ্গমালা ফুলশয্যার রাতেই লাথি মেরে রামগুইত্যাকে ভাগিয়ে দেয়। ফলাফল সামাজিক বিপর্যয়। যবন হলে না হয় তালাক দিয়ে পাকসাফ করানো যেত, কিন্তু রঙ্গমালা যে হিন্দু।

রঙ্গমালার চোখে স্বামী বা শরীর সংক্রান্ত ভাবনার টানাপোড়েন উপন্যাসের জমিদারি ধামার নিচে চাপা পড়ে যায়। রঙ্গমালার বাবা আত্মারাম, তিনি কেন যাত্রাপালা ছাড়লেন কেনই-বা আবার কীর্তনের দলে ভিড়লেন এসব উত্তর উপন্যাসে পাওয়া যায় না। কারণ হয়তো এই যে, তা রাজচন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত নয়। ইতিহাসের এই বাঁক ‘সখী রঙ্গমালা’ উপন্যাসে প্রধান সড়কে পা ফেলেনি, ফলে তা উপেক্ষিতই থেকে গেল। কিন্তু যাত্রাপালার লড়াই দুঃখস্রোতের যে বাঁক তৈরি করে তার ইতিহাস এই উপন্যাসে পাওয়া যায় না। ‘সখী রঙ্গমালা’ উপন্যাসেও ভেতর বার পাওয়া যায় না। যেমন নারায়ণ চৌধুরী। বয়স্ক এই চরিত্রটি কেবলই অংশগ্রহণ করেছে উপন্যাসে। তার ভেতরে জমা ইতিহাস-সময়-কালের চরা-নোনা জল আর জমিদারি হিংস্রতা অনুপস্থিত। কেবল কিছু দৃশ্যে এসে তিনি হাজিরা দেন। এই ঢংটা উপন্যাসময় আছে। পালাগানের মতো আরেকটা বিষয় সখী রঙ্গমালায় পাওয়া যায় না। তা হল স্বর। এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোর স্বর নাই- সংলাপ অপ্রতুল- নানা গুরুত্বপূর্ণ সময়েও কথা বলে না চরিত্রগুলো। জীবনে প্রথম যে রঙ্গমালা তীর্থে যাবার উদ্দেশ্যে ঘরের বার হল সে তখনও কথা বলে না। উচ্ছ্বাস নাই, নদীর জল আর আঁধারে তার অতীত, সংসারহীনতার জোনাক জ্বলে না। সে তখনও কামলীলায় মত্ত। ইতিহাসের চরিত্র বলেই তার মনোজগতও ইতিহাস-কথপোকথনও ইতিহাস।

একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য আছে ‘সখী রঙ্গমালা’য়। রাজচন্দ্রের মা একেবারে উন্যাসের শেষদিকে হারানো পুকুর আবার যখন নারায়ণের দানসূত্রে ফেরত পান তারো পরে ফুলেশ্বরীর পাখিগুলো যখন মেরে ফেলে চান্দা সেদিন তিনি কুয়াশা ভোরে নগ্ন হয়ে স্নান করেন। ফুলেশ্বরীর দাসী হীরা এসে দেখে নগ্ন সুমিত্রার শাদা শাড়ি ভাসে জলে। এই চিত্র আমাদেরই। এখনও এদেশের কূলবধূদের আঁচল জলে ভাসে। নানা কারণেই ভাসে। এর ইতিহাস জরুরি। কিন্তু সেদিকে লেখকের নজর কই। এই উপন্যাসে নারীর অবস্থার বিবরণ আছে তা ঠিক, লড়াইটা নাই। ফুলেশ্বরীর লড়াইয়ের যে হাতিয়ার রাঙ্গার কাটামুণ্ডু, লেখকের নজর সেদিক ফেরে নাই। এখানে একটা সম্মিলন আছে। ইতিহাসটাও এখানে । জরুরি রঙ্গমালার তীর্থ যাত্রাও। তার সাথে রাজচন্দ্রের প্রেমও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উপন্যাসে প্রেম নাই। তাদের মধ্যকার আলাপ নাই। প্রথম শরীর সম্ভোগের যাতনা নাই। ফুলেশ্বরীও যখন প্রথম রাজচন্দ্রের সাথে সঙ্গম করে তখনও সে কেবল রঙ্গমালাকেই ভাবে। কিন্তু তার শরীরে রাজচন্দ্রের প্রবেশের আতঙ্ক নাই। ফুলেশ্বরীর জীবনে এই প্রথম পুরুষ এলো শরীর হয়ে। সেই ইতিহাস চৌধুরী বাড়ির কড়িবরগায় আড়াল হয়াই থাকলো। চৌধুরীর লড়াই পালাগানে রাজচন্দ্র নায়ক- কিন্তু পালাগানের কবির ছলনা আছে এখানে। সে আসলে খল নায়ক। পালাগান জুড়ে রাজচন্দ্রের দাবড়ে বেড়ানো চেহারাটা কদাকার। বরং চান্দা বীরের ভজনা চোখে পড়ে, চোখে পড়ে রাম্যা মগের লড়াই। আর শেষ চমকটা দেয় ইন্দা চৌধুরীর ছোট বউ। চান্দা যখন একে একে কল্লা ফেলে দেয় ইন্দা চৌধুরীদের, অথচ তাকে হারিয়ে দেয় সেই ছোট বউ। ‘সখী রঙ্গমালা’য় যার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন চান্দা। সখী রঙ্গমালায় এই চরিত্রটি অসুস্থ। ইন্দা চৌধুরীর প্রথম বৌ ভাতের সাথে জোঁক খাইয়ে তাকে পাগল বানিয়ে দেয়। জোঁক খেয়ে পাগল হবার সম্ভাবনা নিশ্চয়ই আছে। নইলে এর কোনো ব্যাখ্যা নাই কেন। কিন্তু উপন্যাসে লড়াইটা পাওয়া যায় না। এবং এই মূর্তিটাও জরুরি। আমাদের দেশের ইতিহাসে এমন একটা মূর্তির প্রতিষ্ঠা তার দর্শন আকার এবং তাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মনোজগত তাছাড়া সেই মূর্তি যখন একই সাথে যবন আর হিন্দুদের প্রতীকায়িত করে তখন এই মূর্তির গুরুত্ব আছেই। গুরুত্ব আছে চান্দা বীরেরও। সে কালীর সন্তান। রাম্যা মগের সাথে লড়াইয়ে কালি তাকে বাঁচিয়ে দিলেও ইন্দা চৌধুরীর ছোট বউ-এর সাথে লড়াইয়ে কালী তাকে হারিয়ে দেয়। ফলে এই নতুন মূর্তি স্থাপনের মাজেজা আছে। উপন্যাসে সেই মাজেজা নাই- খালি মূর্তিটা আছে। চান্দাবীরও অগঠিত- সে কালীর সন্তান, উপন্যাসে আর সব কিছুর মত কালীও এক চরিত্র কেবল। রাম্যামগ যেন এক নারীভূক পুরুষ। তার তেজ লড়াই সমস্তই উধাও উপন্যাসে এসে। কারণ এক রাজচন্দ্র আছেন, ইয়া বড়ো তার দাঁতাল খোমা নিয়ে। নরবাড়ি যেমন বিচ্ছিন্ন রাজবাড়িও যেমন বিচ্ছিন্ন সমাজ থেকে, মানে এই উপন্যাসে সমাজ নাই। অসংখ্য চরিত্র আছে কেবল তাদের যাওয়া আসা আছে। সমাজ নাই মানে জনতা নাই, জনরব শোনা যায় না। চাষ নাই, ফসল নাই। ভাষা যে আছে তাও সকলের ভাষা না। নোয়াখালি অঞ্চলের যে সরস ভাষা তা খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশুষ্ক এক ভাষা পাওয়া যায়। খরখরে সেই গদ্যের ফাঁকে ফাঁকে কবিতা কি স্লোক বা গানের পংক্তি মাঝেই মাঝেই বিরক্তিকর ঠেকেছে। অপ্রাসঙ্গিক হয়েছে অনেক জায়গাতেই। লেখকের উপমার দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো। মূল নোয়াখালি অঞ্চলের ভাবরস আয়ত্ত করতে না পারাটা একটা কারণ হতে পারে। তাছাড়া ইতিহাসের সেই সময়ে ঠিক ২০০ বছর আগের কাহিনী পূর্ণগঠনে খেয়ালিপনা বিপত্তি আনতে পারে বৈকি। ধর্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নির্বিকার থাকাটাও বিভ্রান্তিকর। খুব পরিষ্কারভাবেই ব্রাহ্মণদের ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ার নজির আছে। সেই সাথে কায়স্থরা, নিম্নবর্ণ, তাদের কী অবস্থা। যবন মানে মুসলমানদের কী অবস্থা। তাদের সাথে রাজা রাজড়াদের সামাজিক বোঝাপড়া? বিশেষ করে মুসলমান শাসনের রেশ যখন থেকে গেছে। কিন্তু কোন কিছু সম্পর্কেই বুঝবার উপায় এই উপন্যাসে নাই। চান্দা ইঙ্গাদের খতম করে বলছে যবন রাজত্ব খতম, তার মানে কী। মুসলমান বিদ্বেষ? এই বিদ্বেষের পাটাতন কী। এমন অসংখ্য রাজনৈতিক প্রশ্ন নাই হয়ে গেছে। কারণ লেখক আসলে রাজনীতি বিযুক্ত করেই রেখেছেন উপন্যাসটিকে। হয়তো একজন রাজচন্দ্র রাজনীতি বুঝেন না বলে। যুদ্ধের এক বিরক্তির বর্ণনা আছে। তীর্থের যাওয়ার বর্ণনার সাথে যার কেবল হাতিয়ারের পার্থক্য। ঔপন্যাসিক তার ইতিহাস ভ্রমণে ঝাড়া হাত পা হইতে পারেন না। তাকে নানা তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, নানা জায়গায় যাইতে হয়। তারপর যখন ফিরে আসেন তখন তার ওপর ইতিহাস ভর করে, ইতিহাসের কোন অংশ-ঘটনা তারে আছর করে। এই উপন্যাসে যেমন রাজচন্দ্রের আছর আছে, জমিদারী ভূতের নজর আছে। নইলে উপন্যাসটা আদম আলীর হাত ধইরা আগাইতে পারত। বা রাম ভাঁড়ারি, যে কিনা প্রজা এবং রাজার মধ্যকার হাতা। রাজা যারে দান করেন তারে মাইরা রামা আবার তা কাইড়া নেয়। অথবা ফুলেশ্বরী। অনবদ্য এক চরিত্র। কিন্তু এর পাটাতন নাই। খাঁচাবন্দী পাখির মতোই সে। মনস্তত্ত্ব নাই ফুলেশ্বরীর। পাখিগুলা যেমন গায়, সেও তেমনি। সঙ্গমকালে সে রাজচন্দ্রের চোখে সুখে প্রতিভাত হয়। তার নিজের বলে কিছু নাই। পাখিগুলাও না। তারাও তাড়িত, রঙ্গমালা দ্বারা বা আসলে কে বলতে পারে লেখক দ্বারা। কারণ তারা কেন রঙ্গমালঅর গান গাইবে। সব পাখি যদি গান গাইতে পারে এবং একই রকম গানই তারা যদি গায় তাইলে বুঝতে হবে এই সকল পাখি লৌকিক পাখি এবং এরা আসলে জনগণের তৈরি করা ইতিহাস। দাসীদের মহলে একদিন রাতে, যে রাতে ফুলেশ্বরী গিয়েছিল নরবাড়ি রঙ্গকে দেখতে সেই রাত পার করে দাসীদের মহলে তার নিদ্রাভোগের ঘটনায় কেবল এক বিবরণ আছে, অনুভব নাই। এই সময়ে ফুলেশ্বরীর ঘুম আসাটাই খটকা জাগায়। খটকা জাগায় রাজচন্দ্রের আরেক আচরণে। ফুলেশ্বরীর সাথে তার সঙ্গমের স্মৃতি বেমালুম সে ভুলে গেল। ফুলেশ্বরীর যখন গর্ভ হল রাজচন্দ্র কিছুতেই মনে করতে পারলো না যে সে সঙ্গম করেছিল কি না ফুলেশ্বরীর সাথে। তার হাঁটুতে ব্যাথাও ছিল সঙ্গমের সেদিন। এই ঘটনা ভুলে যাওয়া মানে রাজচন্দ্র অসুস্থ বা ফটকা। কিন্তু এমন কোনো আভাস তো নাই উপন্যাসে। ফুলেশ্বরী যে ঘুমালো দাসীদের নিবাসে সেই দাসীরা রাজবাড়ির খাম্বায় দেয়ালে হেলান দিয়ে উদাম উদাস জীবনের যে খেতা পুড়ে, তার আঁচ নাই উপন্যাসে। তারা কেবলই এক দাস। হীরাও। তার যদিও ইতিহাস আছে পরম্পরা আছে তাছাড়া তার কপালই যদি বাঁধা থাকে রাজবাড়ির ভাঁড়ারে তাহলে হীরার কী করবার আছে। কিন্তু হীরার আচরণ কেবল ফুলেশ্বরী আর রাজবাড়ির মঞ্চে। মঞ্চের মতোই একটা আবহ আছে উপন্যাসে। চরিত্রদের যাওয়া আসা আছে, ইতিহাসের মানুষের বিশেষত রাজবাড়ির পোশাক আর ভাষা আছে- জীবনের আর বদলের, ক্ষয় আর যন্ত্রণায় দুঃখ মগন না এই উপন্যাস। উৎসব নাই এই উপন্যাসে। এতো বড় একটা এলাকা, এতো রকম ধর্মের মানুষের বাস, এতোকাল পেরিয়েও তারা কোন উৎসব করে না।

রাজচন্দ্র সব শেষে রাজ্য জয় করে আবারো সুখে বাস করতে থাকা পর্যন্ত গড়িয়েছে উপন্যাস। অথচ নিখোঁজ থাকেন আদম আলী। ইতিহাস কেন পড়তে হয়। ইতিহাস যিনি লেখেন তার জন্যও এই প্রশ্ন জরুরি। তিনি যে ইতিহাসের মাকড়শার জাল ঝুটা সংগ্রহ করেন, স্বাভাবিকভাবেই তার সব তিনি রাখেন না। তার দেখায় যে আদল তৈরি হয় ইতিহাসের, তা-ই তিনি হাজির করেন। ইতিহাসের পূননির্মাণ ফলে অসম্ভব। ইতিহাসও তাই শ্রেণী প্রশ্নমুক্ত নয়। ‘সখী রঙ্গমালা’ শেষ পর্যন্ত রঙ্গমালাদের ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে না। কারণ রাজচন্দ্ররা কী করে তা তারা মনে রাখে না। তারা যাদের মনে ঘৃণা হয়ে দেখা দেয়, তারাই ইতিহাস রচনা করে। নইলে পালাগান তৈরি হয় না।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s