উইলবার স্মিথের ‘রিভার গড’

river god

জান্নাতুন নাহার

১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘রিভার গড’ বইটি। এটি উইলবার স্মিথের মিশরীয় সিরিজের প্রথম বই। প্রকাশের পর থেকেই বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং সেই সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হতে থাকে।

সত্য আর কল্পনার মিশেল, এই বইটি লেখক উইলবার স্মিথকে জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে যায়। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট গৌরবোজ্জ্বল প্রাচীন মিশরের এমন এক অন্ধকার সময় যখন মিশর বিভক্ত ছিল উচ্চ আর নিম্ন দুই রাজ্যে। শাসক ছিলেন দু’জন ভিন্ন ফারাও রাজা, যারা একে অপরের অস্তিত্বকে স্বীকার করতেন না। উচ্চ রাজ্যের রাজা ছিলেন ফারাও মামোস।

মামোসের অধীন সমৃদ্ধ থিবেস নগরীর প্রশাসক ছিলেন লর্ড ইনটেফ। ক্ষমতালোভী আর কুচক্রী ইনটেফের বিশ্বস্ত খোঁজা দাস টাইটার সাথে পরিচয় করিয়েছেন লেখক উপন্যাসের প্রথমেই। ইনটেফের একমাত্র কন্যা লস্ট্রিস আর রাজকীয় সেনাবাহিনীর বীর ট্যানাস এর মাঝে গভীর প্রণয়ে কখনোই ইনটেফের সম্মতি ছিল না। টাইটা ছিল অসামান্য রূপবতী লস্ট্রিস যে কিনা পরবর্তী কালে মিশরের রাণী হয়েছিলেন, তার দেখাশোনায় নিয়োজিত একজন দাস। মূলত, কৃতদাস টাইটার আত্মকথনই এই উপন্যাস। ফারাও মামোসের সময় মিশর ছিল মরুদস্যু আর খুনীদের স্বর্গরাজ্য।

টাইটা স্বপ্ন দেখতো বীর ট্যানাস একদিন এই সব দস্যুদের হাত থেকে তাদের মুক্ত করে মিশরের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু আদিম দাসপ্রথা ভিত্তিক সেই সমাজে একজন কৃতদাসের স্বপ্ন সহজে পূরণ হবার উপায় ছিল না। তবে ওরিসিস দেবতার উৎসবে ফারাওয়ের সামনে ট্যানাসের উদ্দীপ্ত ভাষণের মাধ্যমে টাইটার স্বপ্ন পূরণ হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। বিচলিত ফারাও মামোস দস্যুর কবল থেকে মিশরকে মুক্ত করার কঠিন এক দায়িত্ব দেন ট্যানাসকে। মাত্র দু’বছর সময়ে এ কাজে ব্যর্থ হলে মৃত্যুদণ্ড। সেই থেকে শুরু হয় ট্যানাসের যুদ্ধ। কিন্তু ট্যানাস যখন টাইটাকে সহ তার বাহিনী নিয়ে মিশরকে অরাজকতা থেকে মুক্ত করতে ব্যস্ত তখন ভাগ্যের পরিহাস, লস্ট্রিস বাধ্য হয় ফারাও মামোসের পত্নী হতে। অপুত্রক ফারাও তার বংশরক্ষার আশায় বিয়ে করে লস্ট্রিসকে। ‘রিভার গডে’র গল্প যত এগিয়েছে ততই নতুন নতুন মোড় পেয়েছে। আর প্রতিক্ষেত্রেই পাঠক বিস্মিত হয়ে ভেবেছেন, এটি রাজনৈতিক উপাখ্যান নাকি লস্ট্রিস আর ট্যানাসের প্রেমের গল্প। বইটিতে প্রাচীন মিশরের সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং রাজনীতির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ থেকে স্মিথের এ সম্পর্কিত গভীর দৃষ্টি এবং পর্যবেক্ষণের পরিচয় পাওয়া যায়।

উপন্যাসের সবচাইতে বড় আকর্ষণ হলো এর অপ্রত্যাশিত চমক এবং রহস্য উন্মোচন। একজন নিখুঁত গল্পকারের মতো স্মিথ বয়ান করে গেছেন এমন এক প্রাচীন সময়ের গল্প, বাস্তব সময়ের সাথে সুস্পষ্ট ভাবে পৃথক হওয়া সত্ত্বেও যা সমসাময়িক কালের মানুষের মনে জন্ম দেয় এক অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষার; পাঠককে একীভূত করে গল্পের চরিত্রগুলোর সাথে; শেষ পর্যন্ত তাদের শুভাশুভ পরিণতিতে করে তোলে ব্যথিত, উৎকণ্ঠিত। তাই ‌’রিভার গড’ পড়তে গিয়ে পাঠকের মনে যে প্রশ্নটি বার বার ঘুরে ফিরে আসে তা হলো বাস্তব স্থান কাল আর ইতিহাসের সাথে গড়ে উঠা এই গল্প কি আসলে নিছক একটি গল্প, নাকি এর মাঝে লুকিয়ে আছে গূঢ় সত্যও? গল্পের মাঝে চমক থাকলেও বইয়ের সবচাইতে বড় চমকটি বোধ হয় লেখক সংরক্ষিত রেখেছিলেন শেষের জন্য। সমাপ্তির পর পরিশিষ্ট থেকেই জানা যায়; বছর কয়েক আগে মিশরে রানী লস্ট্রিসের সমাধি আবিষ্কৃত হয়। আর আবিষ্কারটি করেন ডুরেইদ আল সিমা নামে একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ। লেখক উইলবার স্মিথ ডক্ট্রর আল-সিমার আহ্বানেই রানী লস্ট্রিসের সমাধি উন্মোচনে তাকে সাহায্য করেন। সেই সমাধিতেই পাওয়া গিয়েছিল টাইটার লেখা অনেকগুলো হায়ারোগ্লিফিক্স পাণ্ডুলিপি যার অনেকটা জুড়ে ছিল বীর ট্যানাসের দুঃসাহিসী অভিযানের বিবরণ আর সেই সাথে লস্ট্রিসের সাথে তার ভালোবাসার উপাখ্যান। আরো জানা যায়, এই কথক টাইটা ছিলেন রানী লস্ট্রিসের দাস আর লস্ট্রিস ছিলেন প্রাচীন মিশরের এমন এক অন্ধকার সময়ের রানী যখন মিশর ছিল অভ্যন্তরীণ আর বহিঃবিবাদে আক্রান্ত এবং যুদ্ধরত।

মূলত, লস্ট্রিসের সমাধিতে প্রাপ্ত টাইটার স্ক্রোল বা পাণ্ডুলিপিগুলোর ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয়েছে ‘রিভার গড’ বইটি। কোন কোন সমালোচক এই বইয়ের অনেক ঘটনাকে ভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও গল্পের প্রয়োজনে সত্যের সাথে কাল্পনিক ঘটনার অবতারণা হয়তো দূষণীয় নয়। কিন্তু ‘রিভার গড’-এর গল্প এত বাস্তবস্মমত আর নিখুঁতভাবে বর্ণিত যে মাঝে মাঝে মনে হয়েছে এখানে অবাস্তব কোন ঘটনার উল্লেখ হয়তো অপ্রয়োজনীয়। তবু এই সবকিছু ছাপিয়েও ‘রিভার গড’ এক অনবদ্য ফ্যান্টাসি হয়ে উঠেছে আর পূরণ করেছে হাজার পাঠকের এ্যাডভেঞ্চারের আকাঙ্ক্ষা। ধর্ম, রাজনীতি আর ইতিহাস এসবের পাশাপাশি আর যে জিনিসটি ‘রিভার গডে’ পাওয়া যায় তা হলো প্রকৃতি। স্মিথের কলমে যেন জীবন্ত আফ্রিকার মরু আর অনবদ্য মিশরের প্রাণ নীল নদ। উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায়ে নীলের কথা এসেছে বিভিন্ন ভাবে। অনাদি কাল থেকে মিশরের সমৃদ্ধির উৎস এই নীল নদ কখনো ফসলের প্রাচুর্য যুগিয়েছে আবার কখনো হয়েছে চলার পথের বাধা। নদীর দেবী হাপির প্রতি প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাসের কথা এসেছে বহুবার। ‘রিভার গড’ নামকরণের পেছনেও রয়েছে এই নীল নদ।

উপন্যাসের চরিত্রগুলোর ব্যাপ্তি এবং গভীরতা উল্লেখ্য করার মতো। এমনকি টাইটা নিজের বিবরণও দিয়েছেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। তার বর্ণনা মতে টাইটা একজন বুদ্ধিমান মানুষ যিনি একাধারে একজন কবি, লেখক, স্থপতি এবং শিল্পী। দাস হয়েও এইসব গুনের কারণে তিনি ইনটেফের কাছে ছিলেন যেমন প্রয়োজনীয় তেমনি লস্ট্রিসের কাছে ভালবাসার পাত্র। এর প্রমাণ পাওয়া যায় যখন লস্ট্রিস ফারাও মামোসের সাথে তার বিয়েতে যৌতুক হিসেবে দাবী করেছিলেন খোদ টাইটাকে আর সেই দাবী পূরণে তার পিতা ইনটেফের বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। শুধু দাসই নয়, টাইটা ছিল লস্ট্রিসের এমন এক প্রেমিক যে তাকে চিরজীবন ভালবেসে গেছে এটা জেনেই যে কখনো সে তাকে পাবে না। এ সত্ত্বেও বন্ধু ট্যানাস যাতে তার ভালবাসার মানুষ লসট্রিসকে পেতে পারে তার সব চেষ্টাই করেছিলেন। বিচক্ষণতা আর ইন্দ্রজালের গুনে টাইটাকে এক অতিন্দ্রীয় ক্ষমতাধর মানুষ বলেই মনে হয়। তবু টাইটা তো একজন দাসই। তাই ভালবাসার মানুষ হারিয়ে এবং মনিবের নৃশংসতার শিকার হয়ে তাকে একদিন নপুংসক হতে হয়েছিল।

টাইটার জীবনের এই অমানবিক দুঃখ আর সম্পূরক ঘটনাবলী অজান্তেই পাঠককে তার সাথে এক মমতাময় আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করে। গল্পে ছোট বালিকা থেকে লস্ট্রিসের যে ক্রমান্বয়ে এক ব্যক্তিত্বময়ী রানী হয়ে ওঠা, সেটিও টাইটার তত্ত্বাবধানে। একদিকে ভালবাসার মানুষ ট্যানাসের আকর্ষণ অন্যদিকে ফারাও মামোসের স্ত্রী হিসাবে রাজকুমার মেমননের মায়ের ভূমিকা পালন, এই টানাপোড়েনে আবর্তিত হয়েছে লস্ট্রিসের জীবন। মৃত্যুশয্যায় ফারাওয়ের কাছে করা প্রতিজ্ঞা পালনে লস্ট্রিস শেষ পর্যন্ত তার ভালবাসাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, মিশরের জনগণকে রক্ষা করতে গিয়ে যুদ্ধ করেছেন, রাজ্যহারা হয়ে দীর্ঘ দুই দশক আফ্রিকায় নির্বাসিত থেকেছেন। আর ফারাওকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুসারে তাকে সমাহিত করেছেন এমন এক জায়গায় যেখানে তিনি শান্তিতে ঘুমাবেন সুদীর্ঘকাল। মেমননকে বড় করে তুলেছেন একজন যোগ্য রাজা হিসেবে আর তার প্রকৃত পিতৃ পরিচয় গোপনই রেখেছেন চিরকাল। ‘রিভার গডে’র আলোচনা অসমাপ্ত থেকে যায় যদি ট্যানাসের কথা বলা না হয়।

ফারাও মামোসের সেনাবাহিনীর অন্যতম সাহসী যোদ্ধা ট্যানাস। লস্ট্রিসের প্রতি অসাধারণ ভালোবাসা আর দেশপ্রেম এই দুই ধারায় প্রবাহিত ট্যানাসের জীবনে বীরের উপাধি মিলেছে বহুবার। কিন্তু নিয়তির ক্রীড়নক হয়ে প্রিয়তমা লস্ট্রিসকে দেখতে হয়েছে ফারাও মামোসের স্ত্রী হিসেবে। এমনকি লস্ট্রিসের গর্ভে নিজ পুত্র মেমননকে বড় হতে দেখেছেন ফারাও-এর পুত্র রূপে। নিজের হাতে মেমননকে প্রশিক্ষিত করেও কোন দিন পিতার অধিকার পাননি। শেষ সান্ত্বনা হিসেবেই হয়তো তার মৃত্যু হয়েছে মেমননের উপস্থিতিতে। ট্যানাসের মৃত্যু শুধু লস্ট্রিস বা টাইটাকেই নয় বরং পাঠককেও উদ্বেলিত করে; যেন গল্পের মূল সুর হারিয়ে সেটি বিবর্ণ হয়ে যায়। এই মৃত্যুর শোক বেশি দিন সহ্য করতে পারেনি লস্ট্রিস, মৃত্যু তাকেও ডেকে নেয় আর শেষতক হয়তো মিলিয়ে দেয় দুই অতৃপ্ত প্রেমিক হৃদয়কে। কিন্তু মৃত্যুর আগে লস্ট্রিস ফিরে আসেন মিশরে, তার প্রিয় মাতৃভূমি থিবেসে। ফিরে আসেন বিজয়ী বেশে, হিকসস দস্যুদের হটিয়ে মিশরের ফারাও আসনে অধিষ্ঠিত করেন নতুন ফারাও তথা পুত্র মেমননকে।

উপন্যাসের এই অংকে টাইটা আবার ফিরে আসেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে। ট্যানাসের মৃত্যুর পর তার বন্ধুত্বের প্রতিদান দিতে উন্মুখ টাইটা এক অদ্ভুত পরিকল্পনার আশ্রয় নেন। সেকালে মিশরে ফারাও রাজাদের মৃতদেহ মমি করে রাখার প্রচলন ছিল। মমিকৃত দেহকে সমাহিত করা হতো বিপুল ধনসম্পদ আর দেবদেবীর মূর্তি সহ। তারা বিশ্বাস করতো এই ধনসম্পদ মৃত্যুর পরের জীবনে তাদের কাজে আসবে। ফারাও রাজাদের জীবনের অধিকাংশ সময় কাটতো সমাধি সম্পদ সংগ্রহের কাজে। ফারাও মামোসের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। টাইটার বর্ণনা মতে, রাজা মামোসের সমাধির জন্য এত বেশি পরিমাণ সম্পদ সংগ্রহ করা হয়েছিল যা আর কখনো একসাথে করা হয়নি, যার জন্য সমগ্র মিশরকে দরিদ্র হয়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু ফারাও ও মিশরের জন্য প্রকৃত অর্থে জীবন উৎসর্গকারী ট্যানাস সারা জীবন যুদ্ধ আর শত্রুর মোকাবেলা করে গেছেন। সমাধিতে দেবার মতো তেমন কোন সম্পদ সংগ্রহ করতে পারেননি, নেবার মতো কিছু তার কাছে ছিল না। এই বৈপরীত্য টাইটাকে পীড়া দিয়েছিল।

জগতের এই অনিয়মকে শুধরে দিতে টাইটা সেদিন উপেক্ষা করেছিল লস্ট্রিসের নির্দেশ আর ধর্মের বিধিকে। নিজ হাতে টাইটা ফারাও মামোস এবং প্রিয় বন্ধু ট্যানাসের মমিকৃত মৃতদেহ বদল করে দেয়। ট্যানাস সমাহিত হয় ফারাও এর জন্য নির্মিত প্রাচুর্যময় সমাধিতে। এই ছিল বন্ধুর প্রতি তার শেষ প্রতিদান। ট্যানাসের সমাধিতে অনেক জিনিসের সাথে নিজের একটি উশবতি মূর্তি রাখে টাইটা যার গায়ে স্পষ্টাক্ষরে লেখা ছিল – আমি টাইটা, আমি একজন কবি, স্থপতি এবং চিকিৎসক; আমি তোমার বন্ধু। আমি তোমার হয়ে সাক্ষ্য দেব।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s