jose saramago

হোসে সারামাগোর সাক্ষাৎকার

jose saramago
হোসে সারামাগো

অনুবাদ : শেরিফ আল সায়ার

নোবেল কমিটির তালিকায় নাম ছিল বটে, কিন্তু পাবেন পাবেন করেও বহুকাল পুরস্কারের শিঁকে আর ছেঁড়েনি। অবশেষে ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর পর্তুগালের প্রথম সাহিত্যিক হিসেবে নোবেল পেয়েছিলেন হোসে সারামাগো। নোবেল পাওয়ার পর পর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাটাকে আমি নোবেল পাওয়ার পর এমন দায়িত্ব হিসেবে নেব না যেভাবে সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিজয়ীরা নেয়। এমন আসনে কি নিজেকে বসানো উচিত? অবশ্যই না। হোসে সারামাগো ১৯২২ সালে পূর্তগালের এক ভূমিহীন কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সারামাগোর দুই বছর বয়সে তারা পুরো পরিবার লিসবনে চলে যায়, যেখানে তার বাবা পুলিশের চাকরি করতেন। কিশোর বয়সে অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে সারামাগোকে ভর্তি হতে হয় ভোকেশনাল স্কুলে, সেই সময় থেকে তিনি রকমারি চাকরিও করতে থাকেন। যেমন, মেকানিকের কাজ। ১৯৪৭ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে সারামাগোর প্রথম উপন্যাস “Land of Sin” প্রকাশিত হয়। নামটি দিয়েছিলেন তার প্রকাশক। উপন্যাসটির আসল নাম ছিল “The Widow”। এরপর ১৯ বছরের দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৬৬ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ “The Possible Poems” প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৭৭ সালে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস “Manual of Painting and Calligraphy” প্রকাশিত হয়। মাঝখানে সারামাগো সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে যুক্ত হন পর্তুগালের কমিউনিস্ট রাজনীতিতে। ১৯৮০ সালের পর থেকে সারামাগোর প্রকাশনা বাড়তে থাকে। ১৯৭৪-এ কারনেশান বিপ্লবের সময় থেকে লেখালিখির সূত্র ধরে তিনি একজন সাহিত্যিক হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়ে যান। সেই সময়ে পর্তুগালের এলেনতেহো এলাকার একজন কৃষকের ওপর লেখা গল্পটি সকলের নজর কাড়ে। গল্পটি লিসবন পুরস্কারও পেয়ে যায়। Baltasar and Blimunda উপন্যাসটি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর সারামাগোকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়। ১৯৮৭ সালে এই উপন্যাসটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে তাঁর প্রকাশিত প্রথম বই এটি। তার পরবর্তী উপন্যাস “The Year of the Death of Ricardo Reis” প্রকাশিত হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফরেইন ফিকশন পুরস্কার পায় এবং তিনি পেয়ে যান পর্তুগালের পেন ক্লাব পুরস্কারও। সবচাইতে আলোচিত লেখা ছিল ১৯৯১ সালে রচিত যিশু খ্রীষ্টের উপর লেখা “ দি গসপেল অ্যাকোর্ডিং টু জেসাস ক্রাইস্ট” উপন্যাসটি। এ উপন্যাস সারামাগোকে এনে দেয় পর্তুগিজ লেখক এসোসিয়েশন পুরস্কার। তবে এই উপন্যাসটির বিষয়বস্তু বিতর্কের জন্ম দিলে পর্তুগিজ সরকারের ওপর চাপ আসতে থাকে। ক্যাথলিক চার্চ থেকে বইটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়। এই বিষয়ে সারামাগো বলেন, এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই বিতর্ক সৃষ্টির পর সারামাগো এবং তার স্ত্রীকে লিসবন শহর ছাড়তে বাধ্য করা হয়। লিসবন শহর ছেড়ে তারা পাড়ি জমান স্প্যনিশ দীপপুঞ্জ ল্যানজারোতে। যেখানে তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাস করেছেন তাঁর তিনটি পোসা কুকুরসহ। সারামাগোর সবচাইতে অসাধারণ উপন্যাস হলো “ব্লাইন্ডনেস”। এটি পরবর্তীকালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার এনে দেয়। ল্যানজারোতে তার নিজস্ব বাসায় মার্চের এক বিকেলে সারামাগোর সাক্ষাৎকার নেন ডনজেলিনা বারোসো। সেই সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো।

বারোসো: আপনার কি লিসবনের স্মৃতি মনে পড়ে?

সারামাগো: মনে পড়ে সেটা বলা যাবে না, আবার মনে পড়ে না তাও বলা যাবে না। স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে কবি যেভাবে বলেন, এটা এমন একটা অনুভূতি যা নিজের মধ্যে কাঁটার মত বিঁধবে – কিন্তু সত্যটা হচ্ছে গিয়ে আমি এমন কোন অনুভূতি টের পাই না। আমি এগুলো নিয়ে অনেক ভেবেছি। লিসবনে আমাদের অনেক বন্ধু ছিল এবং আমরা সেখানে একবার হলেও যেতাম। কিন্তু আমার লিসবন সম্পর্কে অনুভূতি হলো আমি জানি না আমি এখন কোথায় যাবো – আমি এও জানি না লিসবন সেই আগের মতো আছে কি না। আমি যখন সেখানে কিছুদিনের জন্য যেতাম, এক অথবা দুই সপ্তাহের জন্য, তখন অবশ্যই আমি আমার আগের স্বভাবে ফিরে যেতে পারতাম। তবে সবসময় খুব দ্রুত এখানে যথাসম্ভব ফিরে আসার চিন্তা করি। এই জায়গাটা এবং এখানকার মানুষকে আমি খুবই পছন্দ করি। আমি এখানে খুব ভালো আছি। আমি ভাবতেও পারিনা একদিন আমাকে এখান থেকে বিদায় নিতে হবে। যাইহোক, যেতে হবে, একদিন না একদিন তো বিদায় নিতেই হবে, কিন্তু আমি যাবো আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

বারোসো: আপনি যখন অনেক দূর থেকে ল্যানজারোটাতে চলে আসলেন, আপনার পূর্বপরিচিত জায়গাটি ছেড়ে যেখানে আপনি অনেকগুলো বছর ধরে লিখেছেন, আপনি কি করে নিজেকে এই জায়গাটার সাথে মানিয়ে তুলেছেন, আপনার কি আগের কাজের জায়গাটাকে মনে পড়ে?

সারামাগো: আমি খুব সহজে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছি। নিজের সম্পর্কে আমার বিশ্বাস হলো, আমি এমন একজন মানুষ যে কিনা নিজেকে কিছুর সাথে জড়িয়ে ফেলবে না। আমি সব সময় চাঞ্চল্যহীনভাবে জীবন কাটিয়েছি, সেটা যতই ভালো কিংবা খারাপ হোক না কেন। অবশ্য, যদিও এটা আমার জন্য দুঃখজনক। অন্যভাবে বলতে গেলে, আমি কখনই নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে চাইনি। আমি এখন বই লিখি। এটা আরও বেশী চাঞ্চল্যকর। আমার যে কি পরিমাণ অত্যাচার সহ্য করতে হয় সেটা তোমাকে বোঝাতে পারবো না, কি পরিমাণ সমস্যার সৃষ্টি হয় একটি চরিত্র তৈরি করতে, সেটা একটা সম্পূর্ণ জটিল প্রক্রিয়া। আমি আসলে বোঝাতে চাইছি, আমি তাই করি যা প্রাকৃতিকভাবে আমার দ্বারা সম্ভব। আমার কাছে, লেখা একটা চাকরি। আমি লেখা এবং কাজকে দুইভাগে ভাগ করতে পারি না। আমি শব্দগুলোকে একের পর এক সাজাই, কিংবা একটার সামনে আরেকটাকে, গল্প বলি, আমি বলতে চাই যা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি, কিংবা নিদেনপক্ষে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। মোটকথা আমি এটাকে আমার চাকরি হিসেবেই ভাবি।

বারোসো: আপনি কিভাবে কাজ করেন? প্রতিদিনই কি লেখেন?

সারামাগো: যখন আমি কাজে ব্যস্ত থাকি তখন তার একটা চলমান গতির প্রয়োজন আছে, যেমন, একটি উপন্যাস। আমি প্রতিদিন লিখি। অবশ্যই ঘরের বিভিন্ন কাজ করতে কিংবা ঘুরতে গেলে তা একটু বাধা পড়বে, এছাড়া আমি খুব নিয়মিতভাবেই লিখি। আমি যথেষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে থাকি। আমি নিজেকে জোর করে কাজ করাই না, তবে প্রতিদিন আমি নিজেকে দিয়ে কিছু লেখাই, যেটা সাধারণত দুই পাতার মতো হয়। আজ সকালেও আমি নতুন উপন্যাসের দুই পাতা লিখেছি, এবং আগামীকালও আমি আরও দুই পাতা লিখবো। তোমার কাছে মনে হতে পারে দুই পাতা খুব সমান্য। কিন্তু এছাড়াও তো আরও লেখা আছে, আমি সাধারণ লেখা লিখি, চিঠির জবাব দেই, এছাড়াও দুইপাতা করে হিসেব করলে বছরে প্রায় ৮০০ পাতার কাছাকাছি পৌঁছায়। সবশেষে বলতে হয় আমি খুব সাধারণ। আমার কোন আজেবাজে স্বভাব নেই। আমার মধ্যে কোন নাটকীয়তা নেই। সর্বসাকুল্যে, রোমান্টসিজমও আমার লেখার মধ্যে কাজ করে না। আমি এখানে মানসিক যন্ত্রণার কথাও বলছি না। কাগজ খালি থেকে গেলেও আমি ভয় পাই না, রাইটার্স ব্লক, এইসব ব্যপার আমরা লেখকদের সম্পর্কে শুনে থাকি। আমার এসব সমস্যা নেই, তবে আমার সমস্যা হচ্ছে ঠিক অন্য মানুষের মতো ভিন্ন কোন কাজ করতে গেলে। মাঝেমাঝে যেভাবে আমি চাই সেভাবে হয় না, কিংবা কাজটা হয়-ই না। যখন আমার মন মতো হয় না তখন আমি সেগুলো মেনে নেই। বারোসো: আপনি কি লেখার কাজ কম্পিউটারেই করেন? সারামাগো: করি। আমার সর্বশেষ বইটি আমি টাইপরাইটারে টাইপ করে করেছি। যার নাম The History of the Siege of Lisbon। সত্যি কথা বলতে কি, আমার কী-বোর্ড আয়ত্ত করতে কোন সমস্যা হয়নি। কম্পিউটার একটি নতুন স্টাইল হয়ে এসেছে। অনেকে বলে এটার সাথে কম্প্রমাইজ করতে। আমি এটাকে কম্প্রমাইজ বলব না। আমি এটাকে ঠিক তেমনভাবেই ব্যবহার করি যেভাবে টাইপরাইটার করতাম। আমি যখন কম্পিউটারে কাজ করি তখন মনে হয় আমি টাইপরাইটার দিয়েই কাজ করছি। তবে কম্পিউটার খুব স্বচ্ছ, স্বচ্ছ্ন্দ এবং দ্রুত। সবকিছুই ভালো। আমার লেখার ওপর কম্পিউটার কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। অনেকে বলে, হাতের লেখার লেখা থেকে টাইপরাইটার মতো একটা ভিন্ন স্টাইলে যেতে সমস্যা হয়। আমি এটা বিশ্বাস করি না। যদি কারও নিজস্ব স্টাইল থাকে, ভাষাজ্ঞান থাকে, তাহলে কম্পিউটারে কাজ করতে তার কি সমস্যা? যাইহোক, আমি এই পদ্ধতি চালিয়ে যাবো। এবং এটা খুব স্বাভাবিক। আমি কাগজে প্রিন্টেড কপি দেখে নেই। প্রতিটি পাতা টাইপ শেষ হলে আমি সাথে সাথে প্রিন্ট কপি দেখি। প্রিন্ট করা ছাড়া আমার মনে হয়……..

বারোসো: প্রিন্ট নেওয়ার পর কি কোন পরিবর্তন আপনি করেন?

সারামাগো: একবার যদি আমার কাজ শেষ হয় তখন আমি আমার পুরো লেখাটা আবার পড়ি। সাধারণত তখন কিছু কিছু পরিবর্তন হয় – অল্প পরিবর্তন আনি লেখার স্টাইলে কিংবা বর্ণনায়; তবে বড় কোন পরিবর্তন আনি না। নব্বই ভাগ কাজই ঠিক থাকে। আমি অন্য লেখকদের মতো করি না- যেমন, তারা গল্প শুরু করার পূর্বে একটি সারমর্ম লেখে তারপর সেটাকে বাড়িয়ে ৮০ -২৫০ পৃষ্ঠায় নিয়ে যায়। আমি এভাবে কাজ করি না। আমার বই শুরু হয় বই হিসেবেই এবং বই হিসেবেই বড় হতে থাকে। বর্তমানে আমার নতুন উপন্যাসটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৩২, যেটা আমি কোন ক্রমেই ১৮০ পৃষ্ঠায় নেয়ার চেষ্টা করব না: তারা যেভাবে আছে সেভাবেই থাকুক । সেখানে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু এমন কোন পরিবর্তন আসবে না যা আমার প্রথম সংস্করণে ছিল না। সেখান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে অবশ্যই আমি লিখবো না। পরিবর্তন শুধু আসবে পরিমার্জন করবার জন্য, এছাড়া আর কিছুই নয়। বারোসো: তাহলে আপনি লেখা শুরু করেন একটি নির্দিষ্ট ভাবনা থেকে? সারামাগো: হ্যাঁ, আমি কোথায় যেতে চাই এবং কোন জায়গায় আমাকে পৌঁছাতে হবে এ ব্যপারে আমার পরিষ্কার ধারণা থাকে। কিন্তু এটা কোন দৃঢ় পরিকল্পনা নয়। একদম শেষে, আমি বলি, যা আমি বলতে চাই, তবে আমার উদ্দেশ্য অবশ্যই নমনীয়। আমি যা বলতে চাই তাতে যেন সামঞ্জস্য থাকে: আমি জানি আমি লিসবন থেকে পরটো তে যেতে চাই, কিন্তু আমি জানি না এই ভ্রমণটা সহজ হবে কি না। আমাকে ক্যাসটেলো ব্রানকো পার হতে হবে, যেটা অত্যন্ত ভয়ানক ব্যপার কারণ ক্যাসটেলো ব্রানকো দেশটির অভ্যন্তরে অবস্থিত- একদম স্প্যানিশ বর্ডার- এবং লিসবন এবং পরটো দুইটিই আটলান্টিক কোস্টে অবস্থিত। আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো, যে পথে আমি যাবো সেটা সবসময় আঁকাবাঁকা পথ হবে, সঙ্গীরা গল্পটাকে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করবে, হয়তো এখানে সেখানে কিছু পরিবর্তন দরকার পড়তে পারে যা আগে মাথায় ছিল না। গল্পের অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত দরকার, যার কোন কিছুই পূর্ব নির্ধারিত নয়। যদি গল্পটি পূর্ব নির্ধারিত থাকে- এমনকি এটা যদি সম্ভবও হয়, একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখা থাকতে হবে- তাহলে পুরো কাজটাই ব্যর্থ হবে। একটা বই লেখার আগেই তার অস্তিত্ব তৈরি হয়ে যায়।

বারোসো: আপনি কি সবসময় এইভাবেই লেখেন?

সারামাগো: সবসময়। আমার কাছে লেখার আর অন্য কোন পথ জানা নেই। আমার মনে হয় লেখার এই পথটাই আমাকে অনুমতি দেয়- আমি নিশ্চিত না অন্যরা হয়ত বলবে- যে কোন কাজের জন্য দরকার শক্ত ভিত। আমার বইয়ের প্রতিটি মুহূর্ত এমন যা পূর্বে ঘটে গেছে। যেভাবে কেউ একজন ভারসাম্য তৈরি করে কিছু তৈরি করে, একটি বইও ঠিক সেভাবেই বেড়ে ওঠে- তবে সেখানে থাকে নিজস্ব যুক্তি, সেই কাঠমো অবশ্যই পূর্ব নির্ধারিত নয়।

বারোসো: আপনার চরিত্রগুলো নিয়ে কিছু বলেন। আপনার তৈরি করা চরিত্রগুলো কি আপনাকে বিস্মিত করে? সারামাগো: কোন জীবিত চরিত্রকে লেখক অনুসরণ করুক আমি সেই ধারায় বিশ্বাসী না। যে কোন লেখকের খুব সাবধান থাকা উচিত তার চরিত্রগুলো নিয়ে। চরিত্রগুলো যাতে কোন ভাবেই এমন কিছু না করে বসে যাতে চরিত্রটি সাধারণ বৈশিষ্ট থেকে সরে যায়। চরিত্রগুলো কিন্তু স্বাধীন নয়। প্রতিটি চরিত্র লেখকের হাতের ফাঁদে পড়ে যায়। আমার হাতে সে ফাঁদে পড়েছে এটা কিন্তু সে জানে না। চরিত্রগুলো একটি সূতোয় আটকে গেছে, কিন্তু সূতোটাতে ঢিল আছে; চরিত্রগুলো স্বাধীনতার স্বাদ নিতে পারবে, কিন্তু তারা এমন কোথাও যেতে পারবে না যেখানে আমি তাদের নিতে চাই না। যখনই এমন কিছু ঘটতে শুরু করবে, তখন লেখক সূতো ধরে টান মারবে এবং তাদের বলবে, এখানে আমি নিয়ন্ত্রণকর্তা। চরিত্রগুলো একটি গল্পের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। চরিত্রগুলো গল্পের কাঠামো তৈরিতে লেখককে সহায়তা করে। যখন আমি একটি চরিত্রকে পরিচয় করিয়ে দেই, আমি জানি আমার এই চরিত্রটিকে দরকার; কিন্তু তখনও চরিত্রটি বিকশিত হয়নি- এটা ধীরে ধীরে প্রকাশিত ও বিকশিত হবে। আমি চরিত্রটিকে পূর্ণতা পেতে দেব, কিন্তু এও ঠিক যে এটা এক ধরনের রীতি যে, চরিত্রটিকে নিজস্ব আকারে প্রকাশিত হতে দেওয়া। তাকে আমি সঙ্গ দেব। আমার অবশ্যই চরিত্রটির প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে অথবা এমন কিছু দিয়ে শুরু করতে হবে যা কোনভাবে সম্ভব ছিল না। উদাহরণ স্বরূপ, আমি কোন চরিত্রকে দিয়ে ক্রাইম করাতে পারিনা যদি না কোন যৌক্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমি তোমাকে একটা উদাহরণ দিতে পারি। “ বালতাজার ও বিলমুন্ডা ” একটি প্রেমের গল্প। যদিও, আমাকে বলতে হচ্ছে, এটা সুন্দর ভালোবাসার গল্প। কিন্তু এই গল্পটির একদম শেষ পর্যায়ে এসে আমি বুঝতে পারি আমি একটি প্রেমের গল্প লিখলাম, কোন প্রেমের ভাষা ছাড়াই। বালতাজার কিংবা বিলমুন্ডা কেউ-ই এই গল্পে একবারও এমন কোন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করেনি যেটাকে আমরা প্রেমের সংলাপ বলতে পারি। পাঠক হয়তো ভাববে এটা পরিকল্পনা করা, কিন্তু আসলে না। আমি প্রথমে খুবই অবাক হয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, এটা কিভাবে হলো? আমি একটা প্রেমের গল্প লিখে ফেললাম ভালোবাসার শব্দমালা ছাড়া! এবার একটু কল্পনা করো ভবিষ্যতে কখনও, পূণ-সংস্করণে, আমি যদি কিছু সংলাপে পরিবর্তন আনি তবে দুটি চরিত্রের মধ্যে একটা মেকি ভাব ফুটে উঠবে। আমার তো মনে হয়, কোন পাঠক পূর্বের সংস্করণ না পড়েই বুঝতে পারবে, এখানে কোন একটা সমস্যা আছে। কারণ, কিভাবে এই চরিত্র দুটি হঠাৎ করে একে অপরকে “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলা শুরু করবে?

বারোসো: আমার কাছে, আপনার “ব্লাইন্ডনেস ” উপন্যাসটিতে ডাক্তারের স্ত্রী চরিত্রটিকে খুব বিশিষ্ট মনে হয়েছে। মনে হয়েছে চরিত্রটি আমার কাছে জীবন্ত, একই অবস্থা অন্যান্য চরিত্রগুলোর ক্ষেত্রেও, যদিও তাদের সম্পর্কে পূর্ণ ব্যাখ্যা আপনি দেননি।

সারামাগো: চরিত্রটি তোমার কাছে জীবন্তু হয়ে ফুটে উঠেছে শুনে আমি মুগ্ধ, যদিও কোন চরিত্রের শারিরিক বর্ণনা আমি কখনও দেইনি। আমি মনে করি না একটি চরিত্রের নাক কেমন, কান কেমন তা বলার দরকার আছে। এটা আমার মনে হয় যে, পাঠক একটু একটু করে নিজে চরিত্রগুলোকে গড়ে তুলবে – লেখকের কাজই হচ্ছে পাঠকের হাতে কাজটা তুলে দিয়ে তাকে অংশীদার করে নেয়া।

বারোসো: কিভাবে ব্লাইন্ডনেস উপন্যাসটির ধারণা আপনার মধ্যে বেড়ে উঠেছে?

সারামাগো: আমার অন্যান্য উপন্যাসগুলোর মতই “ব্লাইন্ডনেস ” হঠাৎ করেই আমার ভেতরে বিকশিত হয়েছে। আমি একটি হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছিলাম, হঠাৎ আমার মধ্যে চিন্তা আসলো, কেমন হতো যদি আমরা সবাই অন্ধ হতাম? নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, আমরা সকলেই আসলে অন্ধ। এই ছিল উপন্যাসের সৃষ্টির শুরু। এরপর, আমি শুধু আমার কল্পনাগুলোকে বেড়ে উঠতে দিয়েছি এবং নতুন কল্পনাকে জন্মগ্রহণ করতে সহায়তা করেছি। এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ, কিন্তু এখনও এর পেছনে প্রচুর যুক্তি আছে। “ব্লাইন্ডনেস” উপন্যাসটিতে খুব বেশী কল্পনাশক্তি ছিল না, শুধু কারণ ও ফলের একটি ধারাবাহিক বর্ণনা ছিল।

বারোসো: আমার “ ব্লাইন্ডনেস” খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু এটা পড়া খুব একটা সহজ নয়। অবশ্য অনুবাদটা খুব অসাধারণ ছিল।

সারামাগো: তুমি জিয়োভান্নি পরটিয়েরো কে চেনো? দীর্ঘদিন সে আমার অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছে। ও মারা গেছে। বারোসো: কবে? সারামাগো: এই ফেব্রুয়ারিতে। সে মারা গেছে এইডস রোগে আক্রান্ত হয়ে। সে “ব্লাইন্ডনেস” অনুবাদ করেছে, যখন কাজ শেষ হয়, তার পরপরই সে মারা যায়। অনুবাদের একদম শেষ পর্যায়ে, সে অনুভব করল সে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তারপর সে ওষুধ খাওয়া শুরু করে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে অনেকদিন নিয়মিতভাবে ওষুধ খেতে হতো, কিন্তু সে তা করেনি, ফলে নতুন একটি ঝুঁকি দেখা দেয়। সে অবশ্য কাজ করতে থাকে, কাজ ও স্বপ্ন চালিয়ে যেতে থাকে, এবং সে “ব্লাইন্ডনেস’’ উপন্যাসটি অনুবাদ করতে থাকে। এটা সত্যিই অনেক কষ্টকর মুহূর্ত। বারোসো: অতীতে আপনি পর্তুগাল সম্পর্কে অনেক মতামত ব্যক্ত করতেন। বর্তমান সময়ের পর্তুগাল সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে পর্তুগাল যুক্ত হয়েছে। এই বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন? সারামাগো: তোমাকে একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। একটা সাক্ষাৎকারে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে আমাদের কমিশনার হুয়া ডুয়েস ডে পিনহিয়ারোকে এক পর্তুগিজ সাংবাদিক প্রশ্ন করে, আপনার কি মনে হয় না পর্তুগালের জন্য জাতীয় ক্ষমতা কমে যাওয়া অনেক বিপদজনক ব্যাপার হবে? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, জাতীয় ক্ষমতা বলতে আপনি কি বোঝাচ্ছেন? উনিশ শতকেও পর্তুগিজ সরকার একটা অফিস নিতে পারেনি কারণ বৃটিশ নৌবাহিনী টেগাস নদীতে ঘাঁটি বানিয়ে রেখেছে আমাদের অনুমতি না দেয়ার জন্য। এটার বলে তিনি হেসেছিলেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে একটি দেশের কমিশনার থাকা দরকার যে বিশ্বাস করবে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি অত্যন্ত অসাধারণ, এবং এরপর পর্তুগিজরা নিজেরাই অনুভব করলো যে তারা তাদের জাতীয় ক্ষমতা হারিয়েছে কারণ আসলে আমাদের ক্ষমতা কখনও ছিলই না। যদি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সামনে এগিয়ে থাকে, তাহলে আমাদের রাজনীতিবিদদের, যেভাবে অন্য দেশের রাজনীতিবিদদেরও দায়িত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সময়ে মিথ্যা আশ্বাসই হচ্ছে, গণতান্ত্রিক আলোচনা। গণতন্ত্র বর্তমান বিশ্বে কাজ করছে না। কাজ করছে আর্ন্তজাতিক অর্থনীতি। মানুষরা এগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে বিশ্বশাসন করছে। রাজনীতিবিদরা সাধারণ প্রতিনিধি মাত্র- এটা একধরনের রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার মাঝে সম্পর্ক রক্ষা, যা সত্যিকারের গণতন্ত্রের পরিপন্থি। মানুষ হয়তো আমাকে প্রশ্ন করতে পারে, তাহলে আপনি কি প্রস্তাব করতে চান? আমি কিছুই প্রস্তাব করতে চাই না। আমি একজন সাধারণ সাহিত্যিক, লেখক, আমি লিখি এই বিশ্ব সম্পর্কে যেভাবে আমি তাকে দেখি। পরিবর্তন করা আমার কাজ নয়। আমি সব কিছু একা পরিবর্তন করতে পারবো না, এমনকি আমি এও জানি না কিভাবে তা সম্ভব। আমি শুধু এটাই বলতে চাই, এই পৃথিবীটা যেভাবে আছে, আমি সেটাকে বিশ্বাস করি। এখন প্রশ্ন হলো, আমি যদি কোন প্রস্তাবনা দিতে চাই তাহলে তা কেমন হবে। আমি প্রস্তাব করবো যারা পিছিয়ে পড়ছে তাদের উন্নতি করবার সুযোগ দেয়া হোক। যা খুব বিরোধিতার সৃষ্টি করবে, কারণ সবাই চায় যারা সামনে যাচ্ছে তাদের উন্নতি ঘটুক। পেছনে যারা পড়ছে তাদের উন্নতির মানেটা খুব সাধারণ; আমরা যে জায়গায় পৌঁছে গেছি- তা খুব বড় নয়, কিন্তু যারা উচ্চ মধ্যবিত্ত পর্যায়ে আছে- তাদেরকে স্বস্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করতে দেয়া হোক। পিছিয়ে পড়ারদের উদ্দেশে হয়তো বলতে হবে, আমরা এখানেই সব বন্ধ করলাম, এখন তোমরা যারা কোটি কোটি মানুষ পিছিয়ে আছ তারা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করে নাও। অবশ্যই, এগুলো সব স্বপ্নময় কল্পনা। আমি ল্যানযেরোতে বাস করি, এটি একটি দ্বীপপুঞ্জ যেখানে পঞ্চাশ হাজার লোক বাস করে, তাহলে সারা বিশ্বের বেলায় কি হবে। আমার লক্ষ এই বিশ্বের নায়ক হওয়া নয়, তবে আমি বিশ্বাস করি, এই বিশ্ব আরও সুন্দর হতে পারতো, এবং এটা খুব সহজেই সুন্দর করে গড়ে তোলা যায়। এই বিশ্বাস থেকে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, আমি যে পৃথিবীতে বসবাস করি তাকে আমি পছন্দ করি না। পৃথিবী ব্যাপী বিপ্লব আমার একটি কল্পনা- দয়া করে আমার এই কল্পনাকে ক্ষমা করবেন। যদি আমাদের মধ্যে দুজনই ঘুম থেকে উঠে বলি, আজকে আমি কাউকে কষ্ট দেবো না, এবং পরবর্তী দিন আবার বলি এবং আসলে আমরা এভাবেই চলতে থাকি, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের এই পৃথিবীর মধ্যে একটা পরিবর্তন চলে আসবে। আমি জানি এটা একটা ননসেন্স কল্পনা, এরকম কখনও হবে না। এই সব কিছুই আমার ভেতর প্রশ্নের সৃষ্টি করে। আর ঠিক এই কারণেই আমি “ব্লাইন্ডনেস” উপন্যাসটি লিখেছিলাম। আর এগুলোই আমাকে সাহিত্য নিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং আমি এই ইস্যূগুলোকে সাহিত্যের ভাষাতেই তুলে ধরি। বারোসো: আপনি বলেছেন, “ব্লাইন্ডনেস” লেখাটা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যপার ছিল। এটা কি এই কারণে যে, একজন ব্যক্তি ও তার সঙ্গীদের প্রকাশ্য নিষ্ঠুরতা সত্ত্বেও সবাই অন্ধের মতই রয়ে গেছে। এবং এই বিষয়ে লেখাটি অনেকটাই অস্বত্বিকর, আপনি কি বাস্তববাদী? সারামাগো: আমি সংস্কারবাদী, তবে সবসময় আমি এই ধারণ মাথায় নিয়ে ঘুরি না। আপনি যেই নিষ্ঠুরতার কথা বলছেন, এই নিষ্ঠুরতা তো পৃথিবীতে প্রতিদিন ঘটছে, শুধু উপন্যাসেই তো ঘটছে না। এবং এই মুহূর্তে অন্ধত্ব সারা পৃথিবীতে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের অন্ধত্বকে এখানে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এই অন্ধত্ব আমাদের বাধ্য করে, কোন রকম সংঘর্ষ ছাড়া মঙ্গলগ্রহে প্রাণীর সন্ধানে রকেট প্রেরণে, যেখানে আমাদের এই গ্রহে অসংখ্য মানুষ না খেয়ে পড়ে রয়েছে। তাহলে হয় আমরা অন্ধ, না হয় আমরা পাগল। বারোসো: আপনার সর্বশেষ নিউ ইয়র্ক ভ্রমণ বিষয়ক লেখা “Lanzarote Diaries”- এ আপনি বলেছেন, এই শহরের মধ্যে নদার্ন ম্যানহ্যাটন দক্ষিণে অবস্থিত। সারামাগো: হ্যাঁ। এই দক্ষিণ দিকটি উত্তরে অবস্থিত। বারোসো: আমার আপনাকে বলা উচিত যে, “Lanzarote Diaries” -এ চেলসিয়া হোটেলের বর্ণনা আমি খুব উপভোগ করেছি। সারামাগো: ওহ, এটা অনেক ভয়ঙ্কর ছিল। আমার প্রকাশক আমাকে সেখানে পাঠিয়েছিল, কিন্তু এখনও আমি জানি না এই চিন্তাটা কার মাথা থেকে এসেছে। তারা ভেবেছিল, আমি তাদের বলেছি আমি সেখানে থাকতে চাই। কিন্তু আমি কখনও এমন কিছুই বলিনি। আমি জানি এই হোটেলটি শহর থেকে বাইরে, এবং আমি ভেবেছিলাম তা হয়ত অনেক আকর্ষণীয় হবে, কিন্তু আমি কখনও বলিনি যে, দয়া করে আমাকে চেলসিয়া হোটেল থাকার ব্যবস্থা করে দিন। আমার যতটুকু মনে হয় তারা আমাকে পাঠিয়েছিল কারণ, এর একটি ইতিহাস আছে, কিন্তু যদি আমি একটি অস্বত্বিকর হোটেল পছন্দ করি সাথে ইতিহাসসহ পাবো এবং স্বত্বিকর হোটেলের কোন ইতিহাস নাই…..আমি সর্বক্ষণ নিজেকে এই বলে সান্তনা দিয়েছিলাম। তবে বলতেই হয়, আমি এমন জায়গা কখনও দেখিনি।
বারোসো: ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকায় আপনার প্রচুর পাঠক কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে আপনার পাঠক সংখ্যা খুবই কম।

সারামাগো: খুব বেশী গম্ভীর ধরনের লেখা যুক্তরাষ্ট্রের পাঠকদের কাছে নাড়া দিতে পারেনি। এটা খুব অস্বাভাবিক ঘটনা, যাইহোক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমি যে রিভিউগুলো পাই তা সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করে। বারোসো: সমালোচকদের মতামতকে আপনি কি গুরুত্ব দেন? সারামাগো: আমার কাছে যা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আমি আমার কাজটা ভালো মতো করেছি, আমার মানদণ্ড অনুযায়ী যেটাকে ভালো বলা যায়- এই বইটি আমি সেভাবেই লিখতে পেরেছি যেভাবে আমি লিখতে চেয়েছিলাম। একজন মা তার সন্তানকে জন্ম দেন অনেক ভালো চিন্তা করেই, কিন্তু সন্তানের জীবনটা সন্তানের হাতেই থাকে, মায়ের হাতে থাকে না। ঐ শিশুটাই নিজে নিজের জীবন গড়বে, অথবা অন্যরা তাকে সহযোগিতা করবে জীবন গড়তে, সবকিছুই মায়ের স্বপ্নের মতো হতে হবে এমন তো কোন কথা নেই। সুতরাং, আমার বই নিয়ে আমার যে স্বপ্ন তা যে পাঠকরা বুঝতে পারবে তা তো কখনও হওয়ার নয়। কারণ সেই পাঠকরা তাদের ধারণা থেকেই আমার বইটি নিচ্ছে। আমার ধারণা থেকে নয়। আমি কখনও বলব না, আমার বইটি পড়ে পাঠক মুগ্ধ হয়ে যাবে আর বইয়ের মান কেমন তা পাঠক সংখ্যার উপরই নির্ভর করবে। আমরা জানি এই পুরোপুরি অসত্য ধারণা। বারোসো: যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমনকালে আপনি ফল নদীতেও গিয়েছিলেন, ম্যাসাচুসেটের সেই এলাকায় প্রচুর পর্তুগিজ অধিবাসী রয়েছে। সারামাগো: হ্যাঁ, আমি কিছু মানুষের সাথে যোগাযোগ করেছি। যারা আমার কাজ সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করে তাদের সাথে যোগাযোগ করেছি। বিস্ময় নিয়ে বলতে হয়, আমি সবসময় খুব কোলাহলের মধ্যে দিয়েই সময় কাটিয়েছি, যদিও আমি বর্তমান সময়ে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে খুব কম আগ্রহ প্রকাশ করি। আমার মনে হয়, এই বিষয়টি খুব বেশী আলোচনার জন্ম দিতে পারে কারণ আমি লিখি, এবং যদি আমি লেখক হই, তাহলে কি নিয়ে আমার কথা বলা উচিত? যাইহোক, আমি লিখি, কিন্তু লেখক হওয়ার আগে তো আমাকে বেঁচে থাকতে হবে এবং আমাদের সবাইকেই এই পৃথিবীতে যারা বাস করছে তাদের সম্পর্কে ভাবতে হবে। কিছুদিন আগে আমি পর্তুগালের ব্রাগা শহরে গিয়েছিলাম সাহিত্য নিয়ে একটি আলোচনা সভায়। কিন্তু আমরা সেখানে কথা বলেছি অন্যসব বিষয়বস্তু নিয়ে – পর্তুগালের বর্তমান অবস্থা এবং আমাদের কি করতে হবে এই বিষয়ে। আমি সেখানে বলেছিলাম, মানুষের এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস খুবই জটিল। আসলে ব্যপারটা খুবই সাধারণ। আমরা জানি, আমরা একটি সংঘর্ষময় পৃথিবীতে বাস করছি। সংঘর্ষের মধ্যে দিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে- আমাদের জন্তু-জানোয়ার মারতে হবে, নয়ত অন্য কেউ মারবে এবং আমাদের খাবারটা তারা খেয়ে ফেলবে। আমরা ফলমূল খাওয়া শুরু করলাম; এমনকি আমরা ফুলও কুড়াতে থাকলাম আমাদের ঘরের সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য। এই সবই হচ্ছে অন্য একটি জাতির সাথে আমাদের সংঘর্ষ। জন্তু-জানোয়ারগুলোরও একই স্বভাব। মাকড়শা মাছি খাবে, মাছি খাবে যা তার জন্য খাওয়ার মতো। যাই হোক, এখানেই অনেক বড় পার্থক্য: জন্তু-জানোয়ার হিংস্র নয়। যখন একটি মাকড়শা কোন মাছিকে নিজের পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলবে তখন সে কিছু অংশ আগামীকালের জন্য রেখে দেবে। কিন্তু মানুষ এসেছেই হিংস্রতা নিয়ে। জন্তুরা একে অপরকে অত্যাচার করে না, কিন্তু আমরা করি। এই বিশ্বে আমরাই একমাত্র হিংস্র প্রাণী। এই পর্যবেক্ষণ আমার মধ্যে কিছু প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায়, যেগুলো আমার কাছে যুক্তিসঙ্গত: যদি আমরা হিংস্র হয়ে থাকি, তাহলে আমরা কিভাবে দাবি করি যে, আমরা বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন? কারণ আমরা কথা বলতে জানি বলে? কারণ আমরা চিন্তা করি বলে? কারণ আমরা কিছু আবিষ্কার করতে পারি বলে? আমরা তো এগুলো সবাই করতে পারি, কিন্তু এই পারাটা আমরাদের হিংস্রতাকে বন্ধ করবার জন্য যথেষ্ট নয়। আমি মনে করি, এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা আমাদের নৈতিকতার মধ্যে পড়ে এবং এই কারণেই আমি সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে খুব একটা আগ্রহী নই।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s