নাওমি ক্লেইনের দি শক ডকট্রিন : দি রাইজ অফ ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম

যদি প্রশ্ন করা হয়, নাইন ইলেভেনের ষষ্ঠ বর্ষ পূর্তিতে অর্থাৎ ২০০৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা কোনটি তবে হয়তো কিছুটা বিতর্ক উঠবে। কেউ হয়তো বলবেন, আমেরিকান জনগণের উদ্দেশে দেয়া ওসামা বিন লাদেনের বক্তৃতাই এবারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়। কেউ বলবেন, বিন লাদেনের উত্তরে জর্জ বুশের দেয়া বক্তৃতার কথা। কিন্তু চিন্তাচর্চা বা অ্যাক্টিভিজমের জগতে কিংবা আরো মোটা দাগে বইয়ের জগতে সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কোনো ঘটনার কথা যদি বলা হয় তবে সবার আগে আসবে নাওমি ক্লেইনের নাম। সঙ্গে থাকবে তার নতুন প্রকাশিত বই দি শক ডকট্রিন : দি রাইজ অফ ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম। ১৮ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে বইটি। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বরের আগে থেকে এটি নামি পত্রিকাগুলোতে আলোচনার শীর্ষে এসেছে। ১১ সেপ্টেম্বর এটি পেয়েছে বিশেষ কভারেজ। বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে বইটির। নাওমির অনেক ইন্টারভিউ প্রকাশিত হয়েছে। বই নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কিন্তু সবাই স্বীকার করে নিয়েছেন নাওমির দৃষ্টিভঙ্গির বিশেষত্ব এবং তার বিশ্লেষণের প্রখরতার কথা।
১৯৭০ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন লেখক, সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্টি নাওমি। তার বয়স এখন সাকুল্যে ৩৭। এ বয়সেই তিনি গ্লোবাল ইন্টেলেকচুয়াল পোলে ১১ তম প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীর স্থান অধিকার করেছেন। নোয়াম চমস্কি, উমবার্তো একো, সালমান রুশদির পাশাপাশি স্থান পেয়েছে তার নাম। নাওমির জন্ম কানাডার মন্ট্রিয়লে। তিনি দি ন্যাশন, গ্লোব অ্যান্ড মেইল, দিস ম্যাগাজিন ও গার্ডিয়ান পত্রিকার কন্ট্রিবিউটর।
দি শক ডকট্রিন নাওমির তৃতীয় বই। তার প্রথম বই নো লোগো প্রকাশিত হয়েছিল ২০০০ সালে। কেউ এ বইটিকে বলেন অ্যান্টি গ্লোবালাইজেশন মুভমেন্টের ম্যানিফেস্টো কেউ বলেন বাইবেল। অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন অ্যাক্টিভিস্টদের প্রতিবাদের মুখে যে ডাবলিউটিও কনফারেন্স ব্যর্থ হয় তার এক মাস পর এ বইটি প্রকাশিত হয়। বইটি বড় কর্পরেটদের কার্যক্রমকে ব্যাখ্যা করেছে এবং ব্র্যান্ড নির্ভর ক্রয় সংস্কৃতির কড়া সমালোচনা করেছে। গরিব দেশগুলোর শ্রমিকদের কিভাবে ঠকিয়ে এ কর্পরেটগুলো বিশাল মুনাফা করছে তার বিস্তারিত বিবরণও আছে বইটিতে। বইটিতে বিখ্যাত ব্র্যান্ড ও কর্পরেট নাইকির বিশেষ সমালোচনা করা হয়েছিল। আর এ সমালোচনার জবাবও দিতে বাধ্য হয়েছিল নাইকি কোম্পানি।
২০০২ সালে তিনি প্রকাশ করেন ফেঞ্চেস অ্যান্ড উইনডোজ নামে আরেকটি বই। অ্যান্টি গ্লোবালাইজেশন মুভমেন্টের পক্ষ থেকে তিনি বইটি লেখেন।
এবার বের হলো তার তৃতীর বই দি শক ডকট্রিন : দি রাইজ অফ ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম। ডকট্রিন শব্দটি ইউনাইটেড স্টেটসের রাজনীতিতে খুব পরিচিত শব্দ। শব্দটির অর্থ মতবাদ, বিশ্বাস, রাজনৈতিক দলের তত্ত্বগত শিক্ষা। মনরো ডকট্রিন, নিক্সন ডকট্রিন বা বুশ ডকট্রিন খুব আলোচিত শব্দ। শব্দগুলোর মাধ্যমে ওই সময়কার ইউএস সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি, বিশেষ করে পররাষ্ট্র নীতির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। নাওমি এই সময়টিকে চিহ্নিত করতে চান আঘাত বা আক্রমণের ডকট্রিন হিসেবে। তিনি ইতিহাসের নানা ঘটনার ধারাবাহিকতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিকে ইতিহাসের গতিপথের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দেখিয়েছেন কিভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম দ্রুত ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে গেছে। লেনিনসহ মার্কসিস্ট তাত্ত্বিকরা সাম্রাজ্যবাদকে পুজিবাদের সর্বোচ্চ বিকশিত পর্যায় হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে, গ্লোবালাইজেশনের প্রেক্ষাপটে পুজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজন পড়েছে। ফলে তাত্ত্বিকভাবে বিষয়গুলোকে নতুন চোখে দেখা শুরু হয়েছিল। নাওমি ক্লেইন বিষয়টির প্রতি নতুন আলো ফেললেন। সাম্প্রতিক গ্লোবাল পুজিবাদকে ধ্বংসাত্মক পুজিবাদ নাম দেয়ার মধ্যে চমক আছে। কিন্তু এ চমকের পেছনে আছে নাওমির গবেষণা, বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনার দক্ষতা। ফলে, ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম একটা নতুন ফেনোমেনা হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
নাইন ইলেভেনের ঘটনার স্থানটিকে বলা হয় গ্রাউন্ট জিরো। নাওমি ওই বছরটিকে চিহ্নিত করেছেন ইয়ার জিরো হিসেবে। নাইন ইলেভেনের পর কিভাবে গণতন্ত্র, জনকল্যাণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির রূপকথাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নীতি থেকে হারিয়ে গিয়ে স্রেফ সিকিউরিটি বা নিরাপত্তাই প্রধান বিবেচনার বিষয়ে পরিণত হলো তার একটা বিস্তারিত প্রেক্ষাপট তিনি বর্ণনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন বাজার দখল ও বাজার বিস্তারের জন্য কিভাবে থিঙ্ক ট্যাঙ্কের বদলে ব্যাটেল ট্যাঙ্কের সাহায্য নেয়া হচ্ছে। ইরাকের উদাহরণ এসেছে খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে। দেখিয়েছেন নানা ধরনের পুজিবাদের মধ্যে কিভাবে সংঘর্ষগুলো চলছে। চায়নায় পুজিবাদের বিকাশ, সেখানে সামাজিক শ্রেণীগুলোর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বৈষম্য নিয়ে, সেখানে তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে আলোচনা করেছেন। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রায় পুরোটাতেই মনোযোগ দিয়েছেন নাওমি। ফলে, এর সঙ্গে পাঠক একমত হন বা না হোন, এটি যে সার্বিক বিশ্লেষণের একটি উদ্যোগ তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
নাওমির বিশ্লেষণের কেন্দ্র আমেরিকার অভ্যন্তরীণ ও বাইরের নীতি। তিনি বহু তথ্য-উপাত্ত ও রেফারেন্সের সাহায্যে আমেরিকার বর্তমান শক ডকট্রিনকে চিহ্নিত করেছেন। সাংবাদিক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন।
৫৭৬ পাতার এ বইটি প্রকাশ করেছে মেট্রপলিটন বুকস।
নাওমির এ বইটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে এ ঠিকানায়।

[wjsK=http://www.naomiklein.org/ main ]নাওমি ক্লেইনের ওয়েবসাইট।
[wjsK=http://books.guardian.co.uk/shockdoctrine ]বইয়ের কিছু অংশ পড়া যাবে এ লিঙ্ক থেকে।

নাওমি ক্লেইনের ইন্টারভিউ

ইরাক বিষয়ে কথা বলি। ইরাকে আমেরিকার জড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে আপনি মিডল ইস্টে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভুল পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন না। একটা পাগলা হাস ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের খোজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এভাবেও দেখেন না। আপনি একে নতুন বাজার খোজার বৈধ একটি চর্চা হিসেবে এবং কর্পরেটের নতুন মুনাফার একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখেন।

আমার মতে, এটা খুব জটিল বিষয়। পৃথিবীকে শিক্ষা দেয়ার একটা সংগঠিত পদ্ধতি : দেখো, ‘আমেরিকার কথা না শুনলে কি হয়’… গালফ ওয়ার নতুন করে শুরু করার মজা। আসল ঘটনা হলো, আমেরিকার সামরিক বাহিনী গত ১২ বছর ধরেই ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছে। সবকিছুই সাজানো ছিল। আর ছিল তেল। আমি এটাও ভাবি যে, এমন লোকের অস্তিত্বও আছে যারা সত্যি বিশ্বাস করে যে, তারা মিডল ইস্টে একটি সত্যিকারের মডেল স্থাপন করতে যাচ্ছে। কখনো কখনো এটা একটা আদর্শবাদী ধারণা হিসেবেও সামনে আসে। ইরাক এমন এক রাষ্ট্র হতে পারে, যা হবে মুক্ত বাজার গণতন্ত্রের একটা উদাহরণ। আর এটি পুরো অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত হবে। এ আইডিয়ার একটা লক্ষ্য আছে। যে সহিংসতা ইরাককে পেচিয়ে ধরেছে তা একই সঙ্গে ওই আইডিয়ারও সহিংসতা।

আপনি বইয়ে স্বীকার করেছেন, নতুন আইডিয়ার ক্ষেত্রে সুযোগ সন্ধানী চরিত্র খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। হোক তা বাজারের পক্ষের বা বাজারের বিরুদ্ধ কিংবা অন্য কোনো আদর্শের। সুযোগ কাজে লাগাতে এটা ধ্বংস ডেকে আনে, এমনকি ধ্বংসকর্মকে উসকে দেয় নতুন সুযোগ তৈরি করার জন্য, বিপ্লবী মার্কসিজমেও একই ছদ্মবেশ দেখা যায়…।

আমি সব সময়ই এ আইডিয়াকে ঘৃণা করেছি। বামপন্থী আলাপে কেউ না কেউ থাকেই যে মাইকের কাছে গিয়ে বলবে, কোনো কিছু ঘটার আগে কি পরিস্থিতির আরো খারাপের দিকে যাওয়ার দরকার নেই? আমি এ লোকদের কথা মেনে নিতে পারি না। কারণ যে মূল্যবোধকে আমরা কামনা করি সেটা হলো মানবিক মূল্যবোধ। আর এগুলো হলো পরিষ্কার অমানবিক আইডিয়া। এটা এক অনর্থ কামনা। একটা ধ্বংসের জন্য বসে থাকা যা কি না মানুষের মধ্যে জাগরণ ঘটাবে।

এভাবেই তো রাজনীতি কাজ করে। তাই না?

এটা ভালো হতে পারে। আপনি জানেন, আমি বইটি লিখেছি কারণ আমাদের ইতিহাসকে আরেকটু ভালো করে জানতে হবে। আমি ভাবি, আরো ধ্বংসকর্ম সংঘটিত হতে পারে। সব রকমের পরিসংখ্যান থেকেই জানা যায়, আমরা আরো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। আরো পঞ্চম ক্যাটেগরির হ্যারিকেন আঘাত হানতে পারে। আবারো সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে। এগুলো কখনো আমাকে দিয়ে এ কথাটা বলিয়ে নেয় না। কোনো আনন্দ হয় না আমার। বরং আমি ভাবি, একটা খারাপ সময়ে আছি আমরা। আমি বইটি লিখেছি, কারণ আমি চাই লোকে আরো বেশি করে এ দুর্ঘটনাগুলোকে প্রতিরোধ করতে শিখুক। আমি এটাকে খেলা হিসেবে দেখি না। আমি ভাবি, যখন আমরা ইতিহাসকে জানি এবং এ-ও জানি যে, এ কৌশলগুলো কিভাবে কাজ করে তখন আমাদের খুব বেশি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ব্যবহারকারী ডানপন্থী হোক কি বামপন্থী।

কোনো কোনো দেশে পুজিবাদ একেবারেই সফল হয়নি আপনি কি এটা খেয়াল করেছেন? যেমন আয়ারল্যান্ড। আপনি যদি জনসংখ্যার দিকে তাকান তবে দেখতে পাবেন গত ১০-২০ বছরে অনেক কম মানুষ চূড়ান্ত দারিদ্র্যের মধ্যে আছে।

আমি ভিন্নমত প্রকাশ করি। এ পরিসংখ্যানগুলোর অধিকাংশই চায়না ও ইনডিয়ার। যে দেশগুলো দ্রুত শহরায়নের দিকে এগোচ্ছে। একটা ডলারের কি মানে যখন আপনি একটা খামারে বাস করেন, নিজের খাবার নিজে উৎপাদন করেন আর যথেষ্ট পানি আপনার ব্যবহারের জন্য আছে। আর সেই ডলারটির দাম দিল্লির কাছের সেই বস্তিতে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু অবশ্যই সেখানে সাফল্য এসেছে। একটা পুজিবাদী রাষ্ট্রে বসবাস করাটা চমৎকার একটা ঘটনা। আমি এর থেকে লাভবান হই, আপনি হন। কিন্তু আমাদের এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হচ্ছে যে, এ উপকারটা আমরা অব্যাহতভাবে পাবো না। আর এ জন্য যারা এ সুবিধা চায় তাদের পথ রুদ্ধ করে দাড়াতে হবে। ফলে এখানে নানা অমানবিক অর্থনৈতিক আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। চিকিৎসা ও জনকল্যাণের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

সূত্র : জেড নেট
ভূমিকা ও অনুবাদ : মাহবুব মোর্শেদ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s