bonosai shilpo by mahbub morshed

বনসাই শিল্প
মাহবুব মোর্শেদ
শহরে, শহীদ বাবুরাম সড়কের ৩৩ নম্বর বাড়িতে বনসাই ব্যাপারটি প্রথম আমাদের মনোযোগ এড়িয়ে যায়৷ সেদিন ছিল রবিবার, সময়টা বছরের গ্রীষ্মকাল৷ ‘অরিয়েন্টাল টকিজে’র অচল ভবনের পাশে মরা সাপের মতো পড়ে থাকা বাবুরাম সড়কের দেহে পা রেখে চতুর্থবারের মতো ওই রবিবার আমরা চমকে উঠেছিলাম৷ সন্ধ্যা-উত্তর গাঢ় অাঁধারিতে অতি সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে, তেত্রিশ সংখ্যাটি ৩ দিয়ে ১১ বার বিভাজ্য, এককথাই ভাবছিলাম৷ বাসবী দত্তও দরজা খুলে চমকে উঠেছিল৷ এভাবে চমকে দেয়া আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না৷ তবু সে চমকালে আমরা খুশি হয়ে উঠেছিলাম৷ সে হয়তো ভেবেছিল নিচতলাকে একতলা ভেবে আমরা তার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম৷ ভুল কিন্তু করিনি, একতলার অমিত্রাদির সাথে সেদিন কোনো কথা ছিল না৷ বাসবী দত্তের সাথে ছিল৷ বসবার ঘরে বসতে দিয়ে বাসবী ‘তোদের জন্য চা করতে যাই৷ দাদাকে পাঠাচ্ছি, গল্প কর৷’ বলেছিল৷ ওরা সম্ভবত এতক্ষণ ঠাকুরঘরে ছিল৷ দাদার পোশাক থেকে ধুপধুনোর ঘ্রাণ আসছিল, হয়তো এ কারণেই৷ কিন্তু তার সাথে কিছুতেই আলাপ জমে উঠছিল না৷ ঝুরঝুরে হয়ে পড়া চুনের সিলিং এর দিকে বারবার চোখ চলে যাচ্ছিলো আমাদের৷ এতে আরো অস্বস্তি বোধ করছিলেন তিনি৷ কিছু করার ছিল না৷ তাই দ্বিধা ভরে একবার ফ্যান বাড়াতে, একবার টেবিলের এটা ওটা সাজাতে যাচ্ছিলেন৷ একবার…৷ শেষে ঘরের কোনার দিকে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, যেখান থেকে মানিপ্ল্যান্টের লতাগুলো উঠে জানালা ভরে তুলেছিল৷ তত্‍ক্ষণাত্‍ বিষয়ের প্রতি আমাদের মনযোগ ফিরে এসেছিল৷ স্বল্পায়তন ঘর জুড়ে থাকা গাছগুলো সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠেছিলাম সকলে৷ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বৈজ্ঞানিক নাম কী মানিপ্ল্যান্টের৷ এতেই আলাপ জমে উঠেছিল৷ আগ বাড়িয়ে তিনি মানিপ্ল্যান্ট নিয়ে অনেক কথা বলছিলেন৷ গাছটির দু’দিনে একটি পাতা বেরোয়, লতা বাড়তে বাড়তে কখনো অনেক বেশি হয়ে গেলে মূলগাছ বাঁচিয়ে সাবধানে ধারালো ব্লেড চালাতে হয়৷ ইত্যাদি ইত্যাদি৷ এইসময় চোখের নিচে কালসিটে দাগ, ঘামসিক্ত কপাল আর চা নিয়ে বাসবী এসে দাঁড়িয়েছিল৷ যেন প্রথম থেকে লতানো গাছপালার আসরে আছে সে এমন ভঙ্গিতে দাদার আলাপে মন দিয়েছিল, চা বাড়িয়ে দেবার পর৷ ওদের দারুচিনির গাছ ছিল একটা৷ চা থেকে দারুচিনির কাঁচাপাতার সৌরভ উঠছিল৷ অথচ চায়ের জন্য তাকে ধন্যবাদ দিলাম না, এতই মগ্ন ছিলাম৷ এমনকি ঘরের ফার্ন, ক্যাকটাস বনসাইগুলো নিয়েও কথা ওঠেনি৷ বনসাইগুলো দেখিনি এমন নয়৷ কিন্তু তাতে ভালমতো নজরে দেয়া যায়নি৷ কিন্তু ঐ ভাসাভাসা দেখাটাই মনে ছিল৷ পরে কেউ জিজ্ঞেস করলে মানিপ্ল্যান্টের বৈজ্ঞানিক নাম ভুলে যেতাম আমরা৷ এবং বিস্ময়করভাবে বনসাইয়ের ডিটেইলস মনে পড়তো৷ ঐ দিনটির কথাও ভুলিনি৷ বাসবী দত্তর সাথে সেদিনই আমাদের শেষ সাক্ষাত্‍৷ তখনো, এবং এর পরবতর্ী দুইমাসে আমরা বনসাই নামটি জানতে পারিনি৷ অনাগ্রহ নয়, ব্যস্ততা ছিল৷ অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের জন্য মূলশহর ছেড়ে ব্রহ্মপুত্রের পুরাতন খাতের পাশে উপশহরে চলে গিয়েছিলাম এসময়৷ তখন লোকজন ভাবতো, আমরা বোধহয় দূরের কোনো শহরে চলে গেছি৷ প্রকৃতপক্ষেই, তেমন ঘটতে পারতো৷ কারণ শহরে চাকুরির কোনো সুরাহা হচ্ছিল না৷ এ সময়, ৩৩ বাবুরাম সড়কে আমাদের প্রথম ও শেষ চিঠিটি পাঠিয়েছিলাম৷ শোনা যেত, একই শহরে লেখা এ ধরনের চিঠিগুলো নাকি রাজশাহী, ঢাকা ঘুরে শহরের প্রধান ডাকঘরে পৌঁছায়৷ দিনক্ষণের এই বোধ মনে রেখে আমরা ভাবছিলাম, অমিত্রাদির কথা, বাবুরাম সড়কে আমাদের ধারাবাহিক আড্ডার কথা এবং বনসাইয়ের নাম, পরিচয় এবং বনসাই করণের নিয়মাবলী জানতে চাওয়া আমাদের চিঠিখানা মঙ্গলবার দিন সকাল দশটা ত্রিশ মিনিটে দাদার হাত হয়ে বাসবী দত্তের হাতে পৌঁছে গেছে৷ এরপর ৭৬টি সকাল সাড়ে দশটা কেটে গেছে৷ তবু আমরা জানতে পারিনি বাসবী দত্ত চিঠিটি পেয়েছিল কি-না৷ কারণ, কোন উত্তর আমাদের হাতে আসেনি৷ ধীরে ধীরে বনসাই সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো আমরা ভুলতে বসেছিলাম৷ ‘দৈনিক কল্যাণে’র অফিসে সংবাদের পিছনে ছুটবার যে কাজ পেয়েছিলাম তাতে গাছ-গাছালি থেকে দূরে থাকাটাই শ্রেয় ছিল৷ লেটার প্রেসের কালিঝুলি, তালামারা টেলিফোন সেট এবং সরকারি বরাদ্দের নিউজপ্রিন্টের মাঝে বসে আমরা চারপৃষ্ঠার ডবল ডিমাই ভরাবার সংবাদ খুঁজতাম৷ এই সময় ফিলিপস ১র্৪র্ সাদা কালো টেলিভিশনে কোনো উপলক্ষ ছাড়াই বৃক্ষ সম্পর্কিত একটা অনুষ্ঠান দেখেছিলাম৷ অনুষ্ঠানে একজন বটানিস্ট বোঝাচ্ছিলেন সূর্যের আলোর প্রতি বৃক্ষের সাড়া দেবার পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে কি করে বৃক্ষের শাখাকে শৈল্পিক ভঙ্গিমায় বাঁকানো যায় অথবা শাখার স্থিতিস্থাপকতাকে কাজে লাগিয়ে ধাতব তার জড়িয়ে কি করে বৃক্ষশাখাকে ঢেউ খেলানো, অাঁকা-বাঁকা, গোলাকার ইত্যাদি শেপ দেয়া যায়৷ অনুষ্ঠানটি আবার বৃক্ষের প্রতি, বিশেষত বনসাইয়ের প্রতি আমাদের আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছিল৷ এই সময় একদিন আমরা শুনেছিলাম একটি সাময়িক পত্রিকা নাকি বনসাই নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে৷ তখনো আমরা জানতাম না বনসাই কী৷ প্রতিদিন শেষরাতে পত্রিকা অফিস থেকে আমরা সাময়িক পত্রিকাগুলো হিপ পকেটে করে ফিরতাম সেগুলো থেকে কোনো ফিচার তৈরি করা যায় কিনা এই আশায়৷ সেভাবে বনসাই সংক্রান্ত পত্রিকাটিও এসেছিল৷ আমরা জানতে পেরেছিলাম, বনসাই আসলে কী? এবং ছাপানো ছবি দেখে দেখে জানালা বেয়ে লতিয়ে ওঠা মানিপ্ল্যান্টের কথা মনে পড়েছিল তত্‍ক্ষণাত্‍৷ ওই পত্রিকাতেই লেখা হয়েছিল বনসাই হলো শিল্প৷ এতে আমাদের পুরাতন কামভাব জেগে উঠেছিল৷ আমরা দৈনিকের কাজ করতে করতে ভাবতাম শিল্পের খুব কাছাকাছি মহলে আমাদের কাজ কারবার৷ তাই একটি প্রশ্নই মনে জেগেছিল ‘কি করে?’ এবং এরপরেই ভীতি এবং অনিশ্চয়তা আমাদের জীবন ও চিন্তাকে অধিকার করে ফেলেছিল৷ একদিন, মজনুশাহকে- ‘ভাবেন বনসাই নাকি শিল্প৷’ বলেছিলাম আমরা৷ মজনু আমাদের চাচাত ভাই, মামা অথবা বন্ধু৷ ‘একটা গল্প বলি…’ বলে একটা সত্য কাহিনী শুনিয়েছিলেন মজনু শাহ৷ খুব ধীরে গোপন খবরের সূত্র বলে দেবার মতো করে বলেছিলেন, ডাবল ডেকারে বসে৷ অথবা কোনো থাই রেস্টুরেন্টে৷ একটা মানুষ ঢাকা গিয়েছিল ব্যবসা করতে৷ মটরের পার্টসের ব্যবসা শুরু করে চালিয়েও ছিল তিনমাস৷ তো, তাকে হঠাত্‍ একদিন থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না আর৷ মাস গেল, বছর গেল৷ আত্মীয়-স্বজনরা তার আশা ছেড়েই দিয়েছে৷ এই সময় তাকে খুঁজে পাওয়া গেল৷ ফার্মগেটে, ওভারব্রিজের বামপাশে৷ আল্লা নবীর নাম৷ … হাত পা নেই৷ চোখের কোটর খালি৷ স্মৃতি আছে কি নেই৷ ভিক্ষা করছে৷ মজনু শাহর মনে হয়েছিল লোকটি বনসাই৷ এখন অবশ্য আমাদের কেউ কেউ বলেন, মজনু শাহর সাথে আদৌ কোনো আলাপ ছিল না আমাদের, যেহেতু শহরে কোনো ডবল ডেকার চলে না, থাই রেস্টুরেন্টও নেই৷ কাহিনীটি সত্য-মিথ্যা যাই হোক, সে সময় আমাদের সাথে রাস্তা-ঘাটে অনেক খোড়া, নুলো ল্যাংড়াদের দেখা হতে থাকছিল৷ অথবা এমনও হতে পারে এদের প্রতিমুহূর্তে দেখে দেখে মজনু শাহর ঘটনাটি আমরা বানিয়ে নিয়েছিলাম৷ বানানো কথা হলেও এদের দেখে বনসাইয়ের পংঙ্গু, ল্যাংড়া, ঠেস দেয়া, তার জড়ানো গাছগুলোর ছবি মনে আসতো৷ আমরা ভাবতাম এর শিল্পমূল্য নির্ধারণ করা দরকার৷ কিন্তু শিল্পমূল্য নির্ধারণে ব্যর্থ হয়ে আমরা ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম৷ তখন ডাক্তাররা আমাদেরকে বনসাইয়ের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে বলেছিল৷ খুঁজে খুঁজে সেনানিবাসের কাছে নবীপাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম আমরা৷ সেনানিবাসের লোকেরা আর যাই করুক ফকির, ল্যাংড়া, নুলোদের কাছ থেকে দূরে থাকে, এই ভেবে৷ আমাদের ঘর হতে সৈন্যদের মার্চপাস্ট দেখা যেত৷ প্রতি সকালবেলা স্টপ, এ্যাবাউট টার্ন, হল্ট, এবং বুটের সম্মিলিত শব্দের সাহায্যে আমাদের ঘুম ভেঙে যেত৷ সৈন্যরা আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে বাজারে কিংবা এক টিকেটে দু’টি ইংরেজি সিনেমা চলতে থাকা প্রেক্ষাগৃহে যেত৷ জলপাই কালারটি আমাদের প্রিয় হয়ে উঠেছিল৷ পাখি চেনার মতো কষ্ট স্বীকার করে আমরা একই বর্ণের পোশাক পরা সৈনিকদের ভিন্ন ভিন্নভাবে মনে রাখতে চেষ্ট করছিলাম৷ সেনানিবাসের লোকজনও নানা সূত্রে জানতো আমরা ‘দৈনিক কল্যাণে’র স্টাফ রিপোর্টার৷ একদিন ঘরের সামনে ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের জলপাই কালার টয়োটা থামলে আমরা দেখি মেজর খালেকুজ্জামান নেমে আসছেন৷ ‘আমরা চাই আপনাদের সুকুমার প্রবণতাগুলোর বিকাশ ঘটুক৷’ শক্ত হাত বাড়িয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন মেজর৷ তার কথামতো আমরা বিশাল বাউন্ডারির ভেতর শিশুদের লালন পালনের বিদ্যালয়ে সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটাতে গিয়েছিলাম৷ এখানে, শিশুদের মধ্যে সামরিক শৃংখলা প্রবল৷ কঞ্চি কাঁচা অবস্থাতেই বাঁকাতে হয় একথা মনে রেখে, ছোটবেলাতেই শিশুদের এখানে নিয়ে আসা হয়৷ তারপর মনের মাধুরি মিশিয়ে ছয়বছর ধরে গড়ে তোলা হয় পরিমিত আলোবাতাস ও নির্ধারিত তাপমাত্রায়৷ তাদের কথোপকথনের জন্য নির্বাচিত একহাজার শব্দ শেখানো হয়৷ এই শব্দের আওতার বাইরে তারা ভাব প্রকাশ করে না৷ এদের অন্তরের প্রধান, যৌথ সচেতনতা হলো- ‘দেশপ্রেম’৷ যৌনতা সংক্রামক একমাত্র শব্দ হলো ‘মার্চ এহেড’৷ শিশুরা আমাদের সামনে একই পোশাক সজ্জিত হয়ে মার্চ করলে আমরা অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম৷ ‘অদ্ভুত!’ বলেছিলাম আমরা৷ আমাদের পাশে দাঁড়ানো স্কুলের অধ্যক্ষ সস্নেহ হেসেছিলেন৷ ‘তবু দেশের ভাগ্য যে প্রতিবছর শিশুদের সবচেয়ে মেধাবি অংশটিকে এখানে পাচ্ছি আমরা৷’ স্বগতোক্তি করার মতো করে বলেছিলেন তিনি৷ মার্চপাস্ট দেখতে দেখতে, আমাদের চোখ একবার সারাবছর ধরে ফুটতে থাকা ফুলের গাছগুলোর দিকে চলে গিয়েছিল৷ আর একবার সমান করে কাটা ঘাসের দিকে৷ ‘হঁ্যা ওই ঘাষ অথবা গাছের সাথে তুলনা করতে পারেন৷ একজন মালির সাথেই তুলনা চলতে পারে আমাদের৷’ অধ্যক্ষ বলেছিলেন সাথে সাথে৷ আমাদের বুকের ওপর দিয়ে যেন গোখরা হেঁটে গেল এমনভাবে আমরা সামরিক বাহিনীর বন্ধুদের দিকে তাকিয়েছিলাম৷ আর মেজর জামান আমাদের চোখে মুখে রাষ্ট্রদ্রোহীভাব লক্ষ করে সাবধান থাকতে বলেছিলেন৷ তড়িঘড়ি আমরা ঘরে ফিরে ঘুমিয়েছিলাম৷ তাতে সংকট আরো বেড়ে গিয়েছিল৷ ঘুমের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম স্কুল প্রাঙ্গণের প্রাচীর দেয়া বিশাল অঙ্গনে কোনো শিশু নেই৷ ছয় বছর ধরে বেড়ে ওঠা বনসাই পড়ে আছে সারি সারি৷ এই দৃশ্য দেখার পর ঐ দিন দ্বিতীয়বার আমাদের বুকের ওপর দিয়ে সাপ হেঁটে গিয়েছিল, সাথে সাথে স্বল্পায়তন ঘুমটি ভেঙে গিয়েছিল৷ পরের দিন সামরিক বাহিনীর বন্ধুরা বলেছিল, আমাদের চোখ নাকি পুরোমাত্রায় রাষ্ট্রদ্রোহী বনে গেছে৷ এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাচ্ছিলাম বলে ঘর বদল করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না৷ নতুন যে-স্থানটিতে ঘরভাড়া নিয়েছিলাম সেটি স্পর্শকাতর ছিল না৷ অধ্যাপকদের বাসাবাড়ি ছিল সেখানে৷ গ্রুপ গ্রুপ কলেজ পড়ুয়ারা সারাদিন যাওয়া আসা করতো৷ সারাক্ষণ রমরমা একটা ব্যাপার ঘটতে যাচ্ছে এমন ভাবভঙ্গি ছিল এলাকাটার৷ বাসা নেয়ার ৪র্থ দিনে অধ্যাপক পাড়ার গোপিনাথ মোহান্ত সড়কে টাক মাথার এক অধ্যাপকের সাথে পরিচয়ও হয়ে গিয়েছিল৷ ‘আসেন একদিন বিকালবেলা৷ চা খাবেন৷’ বলেছিলেন তিনি৷ তার সঙ্গের লোকটির দিকেও তাকিয়েছিলাম৷ ‘চায়ের দাওয়াত রইলো৷ বিকালে আসেন একদিন৷’ তিনি পুনরাবৃত্তি করেছিলেন৷ সেদিন জানতে পারিনি, কিন্তু একদিন বিকালবেলা চা খেতে গিয়ে জেনেছিলাম তিনি হলেন ওই অধ্যাপকের ছাত্র৷ ‘আপনাদের পেশাটা বুঝলেন, সার্বক্ষণিক নতুন কাজের৷ ক্লান্তিহীন কাজ৷ আমরা বড় বোরিং কাজ করি৷ খুব রিপিট করে৷ একুশ বছর ধরে একই সিলেবাস৷’ বলে ‘একটু আসছি’ বলেছিলেন অধ্যাপক৷ এবং উঠে পাশের রুমে চলে গিয়েছিলেন৷ তখন ছাত্রটির কথা শুরু হয়েছিল- ‘শিক্ষকতা পেশাটা আসলেই ভীষণ রিপিট করে, বুঝলেন, প্রতিদিন একই বিষয়ে কথা বলা কত বোরিং ভাবতে পারেন?’ তখন শিক্ষকটি ফিরেছিলেন৷ এবং ছাত্রটিকে আমাদের জন্য নোনতা বিস্কুট আনতে বলেছিলেন৷ ‘ছয় বছর ধরে আমার সাথে আছে ও৷ খুব ব্রিলিয়ান্ট৷ পদার্থ বিজ্ঞানে এ শহরে আমার পরে ওই আছে৷’ নোনতা বিস্কুট আনতে গেলে ছাত্রটির প্রসঙ্গে বলছিলেন তিনি- ‘আমার হাতের নির্মাণ৷ তিলে তিলে গড়ে তুলেছি৷ ছয়বছর ধরে বেড়ে ওঠা বৃক্ষ বলতে পারেন৷ প্রথম দিকে খুব গ্রাম্য একটা ভাব ছিল৷ রাশিফলে বিশ্বাস করতো৷ ওর উদ্ভট চিন্তাগুলো বাড়তে দেইনি আর৷ আমার দার্শনিকতা দিয়ে সিক্ত করেছি ওকে৷’ এসব শোনার পর আমাদের পুরাতন বেদনাটা জেগে উঠেছিল৷ ম্যালামাইনের কাপে দেয়া চা বিস্বাদ লাগতে শুরু করেছিল৷ ‘একটু কাজ আছে৷’ বলে অর্ধেক চা খেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা৷ সঁ্যাতসঁ্যাতে সন্ধ্যাটা বেপাড়ার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেশ দেরীতে দৈনিকের অফিসে কাজ শুরু করেছিলাম সেদিন৷ পরদিনও আমাদেরকে খুব বিষণ্ন দেখাচ্ছিল৷ গোপিনাথ মোহান্ত সড়কের চৌরাস্তার মোড়ে অপরিচিত একজন লোক অন্তত তা-ই বলেছিলেন৷ ‘চারিদিকে এত বনসাই৷’ বলেছিলাম আমরা৷ ‘তো কী? গোটা সংসারটাই একটা বনসাই তৈরির কারখানা৷’ ‘সংসার’ শব্দটি উচ্চারণ করার সাথে সাথে আমরা তাকে দার্শনিক ভেবে নিয়েছিলাম৷ পরে অবশ্য তাকে সমাজতাত্তি্বক বলেও ভুল হয়েছিল৷ ‘কি করে?’ আমাদের স্বভাবসুলভ প্রশ্নটি করে বসেছিলাম৷ ‘এতগুলো লজ আর বাইন্ডিংস৷ ভাবেন আপনারা, প্রথম আইনটি যখন তৈরি হলো, তখন মানুষের একটি সম্ভাবনা কিন্তু বাতিল হলো৷ আর ধীরে ধীরে অসংখ্য অনুশাসন, অসংখ্য আইন৷ মানুষের অসংখ্য সম্ভাবনা বাতিল৷ তারপর সোসাইটি৷ সোসাইটি হলো স্বল্পায়তন একটি পাত্র৷ মানুষ অনুশাসনের ছুরি চালিয়ে নিজেকে সোসাইটি নামের টবে নিয়ে বসালো৷ মডার্ন সোসাইটি চায় এই স্বল্পায়তন পাত্রে থেকে চূড়ান্ত বিকশিত মানুষ৷ চূড়ান্ত শব্দটিও কিন্তু নির্ধারণ করে দেবে ইওর সারাউন্ডিংস৷ বৃক্ষের বেলা যেমন ঘরের তাপ, আলো, বাতাস নির্ধারণ করে দেয় কতটুকু বাড়বে গাছটি৷’ ‘কী নাম আপনার?’ প্রশ্ন করেছিলাম আমরা৷ তিনি মাছি তাড়াবার মতো করে এড়িয়ে গিয়েছিলেন৷ বলেছিলেন- ‘প্রশ্ন হলো, বনসাই শিল্প কিনা, প্রশ্ন করতে গিয়ে প্রথমে সোসাইটিকে প্রশ্ন করছেন না কেন? যেটি আর সকলের কাছে শিল্প হিসাবে গণ্য সেটিকে আপনারা সন্দেহ করছেন৷ ভাবছেন না কেন আপনাদের শিল্পবোধের বিচু্যতি ঘটে গেছে৷’ ‘বনসাই আমাদেরকে ভীত করে তোলে৷’ ‘পারিবারিকভাবে জীবন থেকে দূরে থাকার ফল এটা৷ হীনম্মন্যতা৷’ বলে নদীর দিকে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়েছিলেন তিনি৷ আর কোনোদিন তাকে অধ্যাপক কলোনিতে কিংবা গোপিনাথ মোহান্ত সড়কে দেখা যায়নি৷ কিছুদিন আমরা ভেবেছিলাম- তিনি অন্য কোনো শহর থেকে এসেছিলেন৷ পরে শুনেছিলাম শহরের স্থায়ী বাসিন্দা তিনি৷ বছরখানেক আগে কেউ কেউ নাকি তাকে দোকানে ক-২ ব্রান্ডের সিগারেট খুঁজতে দেখেছিল৷ বাজার হতে একসময় হঠাত্‍ করে ক-২ সিগারেট উধাও হয়ে গেলে তিনিও নাকি উধাও হয়ে পড়েছিলেন৷ অর্থনীতির প্রভাষক ছিলেন বলে শহরের তরুণরা তাকে ক-২ স্যার বলে ডাকত৷ ক-২ স্যারের কথামতো আমরা পারিবারিক জীবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম৷ প্রাথমিকভাবে মধ্যম আয়ের একটি পরিবারে আমাদের যাওয়া-আসা শুরু হয়েছিল৷ সেখানে, পারতপক্ষে আমরা শিল্প ও বৃক্ষ নিয়ে কোনো কথা তুলতাম না৷ এমনকি পেশা নিয়েও নয়৷ আমাদের সম্মিলিত চেতনার আতঙ্ক সরাতে ভিন্ন কোনো উপায় ছিল না৷ সময়ে অসময়ে আমরা থানাপাড়ার পারিবারিক জীবনে গিয়ে উপস্থিত হতাম৷ একদিন গিয়ে দেখা গেল গৃহকর্তা নেই৷ তার বিকল্প রূপেও কেউ আসলো না বসবার ঘরে৷ টিকটিকির মতো আধঘন্টা নিষ্কাম হয়ে বসে থাকলাম৷ হয়তো আরো পনেরো মিনিট কেটে গিয়েছিল৷ এসময় নারী কন্ঠে আমাদের উদ্দেশে বলা কথা শুনে চমকে গিয়েছিলাম৷ ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা বেজেছিল দেখেছিলাম৷ ‘এত আসেন ক্যান আপনারা৷’ খানিক রুক্ষ, বয়স্ক নারীকন্ঠ ভেসে আসছিল পর্দার ওপাশ থেকে৷ ‘আমরা ল্যাংড়া, নুলো, বনসাই আর স্কুল কলেজ ভয় পাই৷’ বলেছিলাম আমরা৷ ‘বাড়িতে তিনটা সোমত্ত মেয়ে৷ ওদের চলাফেলায় অসুবিধা হয়৷’ ‘অসুবিধা কী? আমাদেরও তো পারিবারিক জীবন দরকার৷’ পর্দার উদ্দেশে বলেছিলাম আমরা৷ ওপাশ থেকে বিরক্তি প্রকাশক শব্দ উঠেছিল তখন৷ কে যেন গৃহকর্তাকে বকা দিয়েছিল কটু শব্দে৷ ‘মেয়ে তিনটাকে ছয় বছর ধরে গাছ বানাইছে৷ বিয়া দেওয়ার নাম নেই, আর ঘরে দ্যাখো ছেলেপেলেদের আনাগোনা৷’ সমার্থক কথা ভেসে আসছিল থেকে থেকে৷ মেয়েদের পর্দা ঠিক নেই বলেও আক্ষেপ করছিলেন মহিলাটি৷ এই মেয়েগুলোও ছয় বছর ধরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা আর পরিমিত বাতাসে বেড়ে ওঠে বোধ হয়, ভাবছিলাম আমরা৷ তত্‍ক্ষণাত্‍ একতলার অমিত্রাদির কথা মনে পড়েছিল৷ মেয়েগুলোকে পর্দা মুড়িয়ে ছয়বছর রাখার পর কেমন ফ্যাকাসে বনসাইয়ের মতো লাগছিল তা দেখার প্রবল ইচ্ছা হচ্ছিলো৷ আবার প্রবল ভয়ও ছিল ভেতরে ভেতরে৷ তাই কাউকে না জানিয়ে সোজা শহীদ বাবুরাম সড়কে চলে এসেছিলাম, ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে৷ পারিবারিক জীবনেও বনসাই থেকে দূরে থাকতে না পেরে আমাদের মনে আবার অমিত্রাদিকে দেখার বাসনা জেগেছিল৷ এমনকি ল্যাংড়া, নুলো, শিশু, ছাত্র দেখলেও ভীত হবো না এমন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম৷ পরে গতানুগতিক শিল্পবোধে ভেসে যাবার প্রবল ইচ্ছা নিয়ে প্রচার করতে শুরু করেছিলাম- বনসাই হলো শিল্প৷ সে বৃক্ষের হোক বা মানুষের৷

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s